বাংলার গর্ব সুগন্ধি বাংলামতি ধান চাষ
বাংলামতি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ৫০তম জাত। পাকিস্তান ও ভারতে এই ধান বাসমতি সমমানের বলে উদ্ভাবক কৃষি বিজ্ঞানীরা দাবি করেন। বোরো মৌসুমে দেশে কোনো সুগন্ধি ধানের জাত না থাকায় বাংলামতি চাষ করা যেতে পারে। ধানটির উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে হাইব্রিড না হয়েও এর ফলন প্রায় হাইব্রিড ধানের সমান। বাংলামতি ধানের চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে ব্রি বা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর থেকে এখনো কোনো নির্দেশিকা পাওয়া যায়নি। তবে মাঠপর্যায় চাষ করা চাষির অভিজ্ঞতা এবং কৃষিবিদদের সহায়তায় তৈরি নির্দেশনা অনুসরণ করা যেতে পারে- বাংলামতি ধানের চাষ পদ্ধতি ব্রি-২৮ ধানের মত। তবে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করলে ভাল ফলন পাওয়া যাবে যেমন-
বীজ:চলতি বছর বিএডিসি ও কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রক্রিয়াজাত বীজ বাজারে এসেছে। গত বছর পর্যন্ত প্রথম পর্যায় চাষকৃত কৃষকের সংরক্ষিত বীজই বাংলামতি ধানের বীজ প্রাপ্তির মূল উত্স। ১) বাংলামতি ধানের বীজ সংরক্ষণের পর যেদিন বীজ অঙ্কুরোদগমের জন্য পানিতে ভেজানো হবে তার আগে এক থেকে দুই ঘণ্টা রোদে দিয়ে ঝেড়ে রেখে কয়েক ঘণ্টা ছায়ায় রাখতে হবে। ২) অঙ্কুরোদগমের পর ধানের বীজতলায় বীজ গাদাগাদি করে ফেলানো ঠিক নয়। অঙ্কুরোদগমিত বীজ যাতে বীজতলায় সমানভাবে পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৩) ঘন কুয়াশা দেখা দিলে বীজতলার উপরে পলিথিন দিয়ে শেড দিতে হবে। তবে সকালে আকাশ কুয়াশামুক্ত হলে অবশ্যই পলিথিন সরিয়ে দিতে হবে যাতে সূর্যের আলো পায়। ৪) ধানের বীজতলার চারা ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে জমিতে লাগাতে হবে। ৫) ধানের চারা লাগানোর সময় সারিতে লাগালে ফলন ভাল হবে।
৬) এক গোছায় এক থেকে তিনটি চারাই যথেষ্ট। ৭) সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার।
৮) ৬ থেকে ৮ লাইন পরে ১৫ সেন্টিমিটার এক সারি বাদ দিয়ে লাগালে পরিচর্যার জন্য সুবিধা হবে এবং ক্ষেতের মধ্যে আলো-বাতাস চলাচলে সুবিধা হবে।
সার: মাটি পরীক্ষা করে সার দিতে হবে। তবে জৈবসার প্রয়োগ করাই ভাল। ধান লাগানোর তিনমাস আগে ধৈঞ্চা বীজ বপন করে তার বয়স ৩৫ থেকে ৪৫ দিন হলে কেটে
২/৩ টুকরো করে মাটির সাথে মিশিয়ে চাষ দিয়ে পানি দিয়ে রাখতে পারলে এক মাসের মধ্যে তা ভাল জৈবসারে পরিণত হয়। এ ধরনের ক্ষেতে ইউরিয়া সার কম লাগে। তা না হলে ধানের চারা লাগানোর আগে জমি ভালভাবে প্রস্তুত করা এবং শেষ চাষের আগে টিএসপি, এমপি, জিংক ও সালফার প্রয়োগ করতে হবে। তবে জিংক আলাদাভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার ধান লাগানোর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রথম উপরি প্রয়োগ, ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে তৃতীয় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তবে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করাই ভাল। এ ক্ষেত্রে ধানের দুই সারি পরপর ৮ ইঞ্চি থেকে এক ফুট অন্তর মাটির ২ থেকে ৪ ইঞ্চি নিচে গুটি পুঁতে দিতে হবে। ধানগাছে থোড় এলে ইউরিয়া সার দেয়া যাবে না।
কীটনাশক: ধান ক্ষেতে পোকামাকড় দেখা দিলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া ক্ষেতে ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করেও পোকামাকড় দমন করা যায়।
পানি: বাংলামতি ধান উফশীজাত হওয়ার কারণে এর প্রচুর শেকড় গজায় এবং ব্রি-২৮ বা ব্রি-২৯ ধানের চেয়ে এর শেকড় লম্বা ও মাটির গভীরে যায়। যে কারণে এর পানি শোষণ ক্ষমতাও বেশি। লাগানোর পর ক্ষেতে যাতে প্রয়োজনীয় (২ ইঞ্চি) পানি থাকে সে দিকে নজর রাখতে হবে।
কর্তন ও মাড়াই: প্রতি ছড়ার ধান ৮০ ভাগ পাকলেই কাটা যাবে। ধান কাটার পর পরই মাড়াই করতে হবে। মাড়াইয়ের সময় ধান যাতে মাটিতে না পড়ে তার জন্য ত্রিপল, চট, পলিথিন বা খেজুরে পাটি বিছিয়ে মাড়াই করলে ধানের রঙ উজ্জ্বল থাকে। যেহেতু ধানটি সুগন্ধি তাই পালা দিয়ে রাখা কিংবা ভেজানো কোনো রকমই ঠিক না।
বীজ সংরক্ষণ: বীজ সংরক্ষণের জন্য ধানের চারা লাগানোর পর খেয়াল রাখতে হবে যাতে জমিতে আগাছা না থাকে। থাকলে তা উপড়ে ফেলতে হবে। বীজ সংরক্ষণের জন্য ভালমানের ফলনের জায়গা দেখে ধান কেটে সেখানকার বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ দুই-তিন দিন রোদে শুকিয়ে পলিথিনের ব্যাগে মুখ আটকিয়ে অথবা প্লাস্টিক ড্রাম, বালতি বা মাটির পাত্রে রাখতে হবে। বীজধানে পোকা লাগার আশংকা থাকে তাই নিমপাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে দিতে হবে। সংরক্ষিত বীজ ৩ থেকে ৪ মাস পর একবার বের করে পরীক্ষা করে ঘন্টাখানেক রোদে দিয়ে আবার আগের মত সংরক্ষণ করতে হবে।








