লেখকঃ হাসান ফেরদৌস |
গোড়াতেই একটি স্বীকারোক্তি। ই-মেইলে যখন দেখলাম নিউইয়র্কের বনেদি বইয়ের দোকান রিজ্জোলিতে শহিদুল আলমের ছবির বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হবে, যাব কি যাব না—এই দোটানায় ভুগছিলাম। এই শহরে বাংলাদেশ নিয়ে অনুষ্ঠান দৈনিক হয় না, তাও রিজ্জোলির মতো বইয়ের দোকানে। ফলে আগ্রহ ছিল। শহিদুল আলম আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত, ফটোগ্রাফার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেই তাঁকে আমি চিনি। তিব্বতের ওপর চিত্র প্রদর্শনী করে চীনা মাতবরদের বিরাগের কারণ হয়েছিলেন, মনে আছে। ক্রসফায়ার প্রদর্শনী হয়েছিল, তা নিয়েও তুলকালাম কাণ্ড। কিন্তু রিজ্জোলিতে অনুষ্ঠান, অজ্ঞতাবশত ধরেই নিয়েছিলাম, বড়লোকের বৈঠকঘরের কফি টেবিল বই হবে।
ভুল, একদম ভুল। এতে ছবি আছে বটে, কিন্তু এই বই মোটেই ছবির নয়। আকারে, ছাপায়, অঙ্গসৌষ্ঠবে অন্য যেকোনো সেরা কফি টেবিল বইয়ের চেয়ে সে কম নয়, কিন্তু এই বই কেবল বড়লোকের ঘর সাজানোর নয়। এই বই ক্রোধের, বিস্ময়ের, আনন্দের, প্রতিবাদের, আবিষ্কারের। এ জন্য গভীরভাবে সংবেদনশীল শিল্পী ৩০ বছর ধরে টানা এক ব্যক্তিগত অভিযাত্রায় লিপ্ত। এই বই সে অভিযাত্রার প্রামাণিক বিবরণ। এই যাত্রা তাঁর ব্যক্তিগত, তা ঠিক; কিন্তু অন্তর্গতভাবে তা আমাদের সম্মিলিত সফরের বিবরণও বটে। ফলে এই বইয়ের কোনো একটি শব্দ, কোনো একটি ছবিও আমার কাছে অচেনা, অপরিচিত মনে হয়নি।
২৫ বছর আগে শহিদুলকে নিয়ে আমি প্রথম লিখেছিলাম ঢাকার একটি ইংরেজি পত্রিকায়। সে সময় তিনি দেশের সবচেয়ে দামি ফটোগ্রাফার। ইংল্যান্ড থেকে ফিরেছেন রসায়নশাস্ত্রে পিএইচডি নিয়ে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন অধ্যাপনাও করেছেন। অথচ তাঁর আগ্রহ ফটোগ্রাফিতে। আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু জানিয়েছিল, এক ফটোসেশনের জন্য শহিদুলকে গুনে গুনে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাকে। ছবি দেখে বিস্মিত হয়নি, কিন্তু কথা বলে ভালো লেগেছিল। তখনই বুঝেছিলাম, শুধু ফটোগ্রাফি তাঁর উদ্দেশ্য নয়। এটি কেবল একটি ‘টুল’, যা তিনি ব্যবহার করতে চান অনেক বড়, ব্যাপকতর একটি মানবিক ন্যারেটিভ নির্মাণে। গত ৩০ বছরে একটু একটু করে সেই ন্যারেটিভ তিনি নির্মাণ করেছেন। এই বই তার প্রমাণ।
শহিদুলের বইয়ের নাম মাই জার্নি অ্যাজ এ উইটনেস। ইতালির প্রকাশনা সংস্থা স্কিরা ও ঢাকার বেঙ্গল ফাউন্ডেশন যৌথভাবে বইটি প্রকাশ করেছে। এই দুই সংস্থা ঠিক করেছে, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের সেরা ৪০ জন চিত্রকর, স্থাপত্যশিল্পী ও চিত্রগ্রাহকের সেরা কাজের সংকলন তারা প্রকাশ করবে। শহিদুলের এই ‘অভিযাত্রা’ দিয়েই তার শুভারম্ভ হলো।
সচেতন, চিন্তাশীল ও বিবেকবান লেখক, কবি ও শিল্পী বরাবরই তাঁদের কাজের ভেতর দিয়ে নিজের সময়ের সাক্ষ্যভাষ্য নির্মাণ করেন। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, কবিতা কীভাবে তার সময়ের সাক্ষ্যভাষ্য হয়ে ওঠে। যেমন, শামসুর রাহমানের নিজ বাসভূমে। একান্ত ব্যক্তিগত সে ভাষ্যও তাঁর সময়ের আয়না হয়ে উঠেছে, তাতে শোনা গেছে পুরো একটা নাগরিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ ও তার সাহসের বিবৃতি। শহিদুলের ছবিও সেই রকমের সাক্ষ্যভাষ্য। অধিকাংশ ছবির সঙ্গে রয়েছে সে ছবির পেছনের ইতিহাস। গল্পের মতো সে ইতিহাস তিনি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। কিন্তু যে ইতিহাসের সাক্ষী শহিদুল, এই বইতে যাদের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন, সে ইতিহাসের কারিগর সাধারণ মানুষ। তিনি সে সব মানুষেরই কথা বলতে চান, যাদের রক্তে ও ঘামে গড়ে উঠেছে নগর, নির্মিত হয়েছে সভ্যতা। অথচ পৃথিবীর কোনো ইতিহাসের বইতেই তাদের পরিচয় মেলে না। অথচ এদের কথা বলা না হলে মানুষের ইতিহাস পূর্ণ হবে, এমন একটা জরুরি তাগিদ থেকে নিজের ঘাড়ে সেই ইতিহাস বলার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন তিনি নিজেই।
এই গ্রন্থে ভালো ছবির, স্মরণীয় ছবির কমতি নেই। আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো বইয়ের একদম প্রথম ছবিটি। ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় তোলা সাদা-কালো একটি ছবি। পর্দার পেছনে একজন নারী ভোট দিচ্ছে। সেই নারীর মুখ আমরা দেখি না, কী করছে তাও খুব স্পষ্ট নয়। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত সে ছবিতে নজর দিতেই ক্রমেই তার চেহারাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার চোখ, মুখ কোনো কিছুই আমি দেখি না, কিন্তু কিছুই আমার গোচরের বাইরে থাকে না। আমি দেখি, গভীর মনোযোগে মেয়েটি ভোট দিচ্ছে, সম্ভবত তার জীবনের প্রথম ভোট, এই মুহূর্তে এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো কাজ, অপর কোনো দায়িত্ব তার নেই। সকল কালো ছাপিয়ে সে ছবিতে আমি ক্রমেই দেখি আলোর রেখা।
আশাবাদী ছবি, কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণের চেষ্টা তো খুব মধুর হয়নি। সে হোঁচট খেতে খেতে এগোচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে দেশের যেসব মানুষ রাস্তায় নেমেছিল—মহিদুলও তাদের একজন। তাদের আশা পূর্ণ হয়নি। এক পা আগায় তো হটতে হয় দুই পা। ১৯৯১-এর নির্বাচনী প্রচারণার সময় খালেদা জিয়ার একটি ছবি শহিদুল তাঁর বইতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সুখী, আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষের ছবি। পরের পাতায় রয়েছে তাঁর দলের বিজয় সভার ছবি। সে ছবিতে খালেদা জিয়া নেই, আছেন তাঁর সভাসদেরা। মঞ্চে হাত-পা বিছিয়ে কুৎসিত দর্শন কিছু মানুষ, চোখে কালো চশমা। ক্লোজআপে তোলা ছবি, দেখে মনে হয় রাজনৈতিক সভা নয়, কোনো মাফিয়া চক্রের গোপন বৈঠক। এটিও সাদা-কালো ছবি, কিন্তু এখানে সাদার চেয়ে বড় হয়ে ধরা দেয় কালো—ঘন, গভীর, নির্মম আঁধার ভরা সময়ের কালো।
বাংলাদেশ বলতে একসময় বোঝাত বন্যা, দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ। সেসব ছবি তুলতে বিদেশ থেকে ভাড়া করা ফটোগ্রাফার আসতেন। অতিথি পাখির চোখে যা দেখতেন, সে ছবি তুলে আবার ফিরে যেতেন। শহিদুলের ক্যামেরাতেও বন্যার ছবি আছে, কিন্তু তাঁর ছবির লক্ষ্য মানুষের দীনতা নয়, তার অন্তর্গত মানবতা। দেশের মানুষের বেদনার ও আনন্দের অংশীদার না হলে সেই মানবতার খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। ১৯৮৮ সালের প্রবল বন্যার একাধিক ছবি আছে এই বইতে, তার মধ্যে একটি ছবি আমাকে বিস্মিত করেছে। বেতের তৈরি একটি টুকরির ছবি। চারদিকে থই থই পানি, ঘরের চাল ছুঁয়ে যায় সেই পানিতে। এরই মধ্যে এক গাছের ডগায় আটকে আছে টুকরিটি। বন্যার জলে ঘর ভেসে গেছে, ভেসে গেছে গৃহস্থের সকল সম্বল। সবচেয়ে জরুরি এমন কিছু জড়ো করে রাখা হয়েছে সেই বেতের বাক্সে, যদি রক্ষা পায় এই আশায়। সব জল, সব প্লাবন ছাপিয়ে এই ছবিতে আমি স্পষ্ট দেখি বানভাসি সে গৃহস্থের উদ্বিগ্ন মুখখানি।
একটি কিশোরের ছবি দেখি এই বইতে। গৃহভৃত্য বালকটি দরজার বাইরে বসে উঁকি দিয়ে টেলিভিশন দেখছে। এই ছবি নাগরিক মধ্যবিত্তের অতি পরিচিত। বইয়ের পাতায় ছাপা হওয়া এই ছবি দেখে যদি কারও মনে অনুতাপ ও অপরাধবোধ না জাগে, তাকে আমি সৎ মানুষ বলব না। নিজ বাসার গৃহভৃত্যের এই ছবিটি ছাপার পর শহিদুলের মা দেখেছিলেন। লজ্জাও পেয়েছিলেন। না, তার পর থেকে ছেলেটিকে আর বাইরে বসে টিভি দেখতে হয়নি।
গত তিরিশ বছরে শহিদুল কেবল ছবিই তোলেননি, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজও সেরে উঠেছেন। দৃক এই নামে একটি আধুনিক গ্যালারি ও অন্তর্জাল-ভিত্তিক ফটো আর্কাইভ গড়ে তুলেছেন তিনি। নয় বছর পরিশ্রমের পর ‘পাঠশালা’ নামের ফটোগ্রাফির একটি স্কুল দিয়েছেন, বিশ্বের সেরা ফটোগ্রাফাররা সেখানে আসেন শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখাতে। ‘ছবি মেলা’ নামে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক ফটো উৎসবের ব্যবস্থাপনা করেছেন তিনি। পৃথিবীর সেরা ফটোগ্রাফারদের অংশগ্রহণে সে উৎসব এখন আন্তর্জাতিক ফটো উৎসবে রূপ নিয়েছে। পৃথিবীর সেরা ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি নিজস্ব ফোরামও গড়ে তুলেছেন শহিদুল। লন্ডনভিত্তিক এই সংগঠনের নাম ‘মেজরিটি ওয়ার্ল্ড’। ব্রাজিলের বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী সেবাস্তিয়াও সালগাদো লিখেছেন, ছবি তোলা যার যার নিজের কাজ, অথচ সেই একক কাজটিকেই একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক মেসেজ এনে দিয়েছেন শহিদুল তাঁর মেজরিটি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে। এসব কাজের যেকোনো একটি সফলভাবে করা গেলেই আমরা তাঁকে সফল মানুষ বলতাম। কিন্তু শহিদুল এক কাজে সন্তুষ্ট হওয়ার লোক নন। তাঁর এই কাজপাগল অভ্যাসের কথা মাথায় রেখেই ভারতের বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক রঘু রাই এই গ্রন্থের মুখবন্ধে মন্তব্য করেছেন, ‘ভারতে ভালো ফটোগ্রাফারের অভাব নেই। ভালো আর্ট ও ফটো গ্যালারিরও অভাব নেই। ভালো পত্রপত্রিকার কথা তো উঠছেই না। কিন্তু আমাদের দেশে একজন শহিদুল আলম নেই, যে এসব মাধ্যমকে একত্র করে একটি সামাজিক ও সৃষ্টিশীল শক্তিতে পরিণত করতে পারে।’
রিজ্জোলির অনুষ্ঠানে শহিদুলের বইয়ের সম্পাদক রোজা মারিও ফালভো এসেছিলেন। শহিদুলের সঙ্গে কাজ করতে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন কয়েকবার। শুধু ঢাকায় নয়, একদম প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত। কথায় কথায় বললেন, ‘সে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। এক মুহূর্ত ঠায় বসে থাকার উপায় নেই। অভাবের দেশ, নেই নেই এর দেশ। অথচ এরই মধ্যে এমন সব অদ্ভুত কাজ করছে শহিদুল, ভাবলে অবাক হতে হয়। ওর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়—ইম্পসিবল ইজ নাথিং।’
শহিদুলের বই মাই জার্নি এজ এ উইটনেস দেখার পর আমি এখন সে কথায় বিশ্বাস করি।








