কিশোরী মেয়েটির নাম রাচেল ক্রো। বয়স ১৩ বছর। এরই মধ্যে সে উদীয়মান সংগীত শিল্পী হিসেবে গোটা আমেরিকা জুড়ে হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছে। ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ ডলারের (আমাদের দেশের হিসেবে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা) নতুন প্রতিভা অন্বেষণমূলক সংগীত প্রতিযোগিতা ‘দি এক্স ফ্যাক্টর’-এর সে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় প্রতিযোগী। সংগীতে অসামান্য প্রতিভার কারণে সে লক্ষ লক্ষ দর্শক-শ্রোতার মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কাছে সে এখন রীতিমতো এক ‘রাইজিং সুপারস্টার’।
এই ক্ষুদে শিল্পীর পেছনের জীবনটা কিন্তু এমন উজ্জ্বল আর বর্ণময় ছিলো না। এক প্রগাঢ় অন্ধকার আর করুণ কাহিনীতে ভরা তার জন্ম আর শিশুবেলা। রাচেল তার মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় তার মা ছিলো মাদকসেবী। সে অবস্থায়ই তার জন্ম এক জীর্ণ, ভাঙ্গাচোরা খুপরিঘরে। বাথরুমের মতো ছোট্ট সেই ঘরে পাঁচজন মানুষের ঠাসাঠাসি বসবাস। জীর্ণ-শীর্ণ, হাড্ডিসার এক হতভাগ্য ‘ফেলনা’ শিশু হিসেবে এখানে তার দুঃখময় জীবন কাটতে থাকে, পরে তাকে এতিমখানায় রাখা হয়। কিন্তু ছয়মাস পর হঠাত্ যেন অদৃশ্য থেকে নেমে এলেন এক আলোকিত দেবী; এক মমতাময়ী মা— বুকভরা স্নেহ আর ভালোবাসার এক আশ্চর্য জাদুই চেরাগ হাতে। সেই মমতাময়ী আলোকিত নারীর নাম বারবারা ক্রো— এক হাসপাতালের সাবেক কাউন্সেলর বা পরামর্শক। তারই মমতার স্পর্শে সেই হতভাগ্য শিশুর জীবনটা আমূল পাল্টে গেলো। জীবনের সমস্ত গ্লানি আর অন্ধকার কেটে গেলো। সে এখন সুরের জগতের সাড়া জাগানো এক বিস্ময় বালিকা, এক অসাধারণ ‘হ্যামিলনের বাঁশিঅলা’।
কিশোরী রাচেলের ওপর গত ৮ নভেম্বর, ২০১১ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে আমেরিকার বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা ‘দি নিউইয়র্ক পোস্ট’। নিবন্ধের লেখক লিন্ডসে পার্কার তার নিবন্ধের শিরোনামে রাচেলকে ‘সানশাইন সিংগার’ বা সূর্যের মতো প্রভাময়, আলোকিত গায়িকা বলে সম্মানিত করেছেন। জানা যায়, শিশু রাচেলের বয়স যখন ছয়মাস তখন তাকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন বারবারা। এর বছরখানেক পরে তিনি আইনের মাধ্যমে পাকাপাকিভাবে দত্তক নেন তাকে। আর এভাবে রাতারাতি লেখা হয়ে গেলো রাচেলেরর সোনালি ভবিষ্যত্। ক্রো পরিবারের প্রিয় সদস্য হিসেবে বেড়ে উঠতে থাকে সে। মুছে যায় তার অতীত জীবনের কালিমা। তার দত্তক বাবা-মা-ই হয়ে যায় তার আসল বাবা-মা— তার ভাষায়, ‘চমত্কার বাবা-মা’। তার প্রকৃত বাবা-মা’র খোঁজ এখন কেউ জানে না; তারাও হয়তো জানে না, সেই জীর্ণ-শীর্ণ ফেলনা শিশুটিই আজ আমেরিকার সংগীত-আকাশে সাড়া জাগানো এক ‘রাইজিং সান’ বা উদীয়মান সূর্য এবং ভবিষ্যতের সুপারস্টার!
রাচেল তার অতীতের দুঃখময় জীবনের কথা একেবারেই ভাবতে চায় না। বর্তমানই তার কাছে সব। এই উজ্জ্বল বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়েই সে উজ্জ্বলতম ভবিষ্যতের বুকে পা রাখতে চায়। সদা হাসিখুশি আর প্রবল আত্মবিশাসী সে। তার মেধা আর উপস্থিত বুদ্ধিও প্রখর। তাকে প্রশ্ন করা হয়, সংগীত প্রতিযোগিতার ৫০ লক্ষ ডলার জিতলে সেই টাকা দিয়ে সে কি করবে? সপ্রতিভ রাচেল তখন চমত্কারভাবে যে জবাব দেয় তার মধ্য দিয়ে তার জীবনের একটা মহত্তম স্বপ্ন পাখা মেলে। সেই স্বপ্ন হলো: পুরস্কারের টাকা দিয়ে অসহায়, হতভাগ্য শিশুদের জন্য সে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে— যা তাদের সর্বাত্মক কল্যাণ করবে। সেখানে তাদের জন্য গান, অভিনয়, খেলাধুলো এবং অন্য নানান সুযোগ থাকবে। সেখান থেকে তারা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাবে। ‘আমি তাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করতে চাই, যার মাধ্যমে তাদের স্বপ্ন পূরণ হবেই’— সুদৃঢ় প্রত্যয় রাচেলের।
দুঃস্থ, অবহেলিত, অসহায় শিশুদের কল্যাণে সুদূর মার্কিন দেশের এক কিশোরীর অদম্য সোনালি স্বপ্ন সফল হোক। আমরাও যেন রাচেলের মতো সুন্দর স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের দেশের অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারি, দুঃখী মানুষের সাহায্য করতে পারি— এ-ই হোক আমাদের সবার চাওয়া!








