শান্তিতে সংকটে সর্বত্র মোরা
সামরিক বাহিনীতে অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেতে আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতার পরে পার হতে হবে নির্বাচনের বেশ কয়েকটি ধাপ। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মৌখিক, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াও রয়েছে ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি) পরীক্ষা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মারজান ইমু
বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় চলতে থাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়া। সাধারণত জানুয়ারি ও জুনে সেনাবাহিনীর ক্যাডেট নির্বাচন শুরু হয়। নিয়োগ পেতে নির্বাচনের বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। তবে আগ্রহী প্রার্থীদের তুলনায় উত্তীর্ণের হার অনেক কম।
প্রাথমিক নির্বাচন
প্রাথমিক নির্বাচনের দুটি ধাপ রয়েছে_প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় প্রার্থীর বয়স, ওজন, উচ্চতা, বুকের মাপ, কালার ভিশন, দাঁত, হাঁটু ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। আর মৌখিক পরীক্ষায় মূলত সাধারণ জ্ঞান এবং কমিউনিকেশন স্কিলের ওপর দক্ষতা যাচাই করা হয়। এ ছাড়া প্রার্থীর আচরণ, বাচনভঙ্গি, নিজেকে প্রকাশ করার দক্ষতা, চলমান বিশ্ব সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান কতটুকু তাও যাচাই করা হয়।
লিখিত পরীক্ষা
প্রাথমিক নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ গণিত এবং সাধারণ জ্ঞান_এ চারটি বিষয় থেকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলায় সাধারণত ব্যাকরণ থেকেই প্রশ্ন করা হয়। কারক, সমাস, সন্ধি বিচ্ছেদ, প্রতিশব্দ, বিপরীত শব্দ, বাক্য সংকোচন, বাগধারা, প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ, এক কথায় প্রকাশ, প্রবাদ বচন, বিরাম চিহ্ন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন হয়। ইংরেজি বিভাগে Tense, voice change, narration, correction, changing sentence, Idiom & phrases, pairs of words, use of right form of verbs, Appropriate preposition ইত্যাদি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন হয়। সাধারণ গণিত বিভাগে পাটিগণিত এবং বীজগণিত দুটি বিষয়েই প্রশ্ন হয়। এ ছাড়া ত্রিকোণমিতি থেকেও কিছু প্রশ্ন হয়। সাধারণ জ্ঞান বিভাগে সাম্প্রতিক বিশ্ব ইতিহাস, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, চুক্তি ও সনদ, সংগঠন ও তার সদর দপ্তর, বিভিন্ন দেশের শহর, রাজধানী ও মুদ্রা, খেলাধুলা, রাজনীতি, বিশ্বযুদ্ধ, বিখ্যাত লেখক ও সাহিত্য, ঘটনাবহুল বছর, বিশ্বকাপ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড
প্রাথমিক বাছাই ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি) পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়, আইএসএসবির মেয়াদকাল চার দিন। বর্তমানে আইএসএসবিতে প্রার্থীদের যাচাই করা হয় ত্রিমাত্রিক নির্বাচন পদ্ধতিতে। ত্রিমাত্রিক পদ্ধতিতে থাকে পরিবেশগত দিক, শারীরিক দিক ও মনস্তাত্তি্বক দিক। প্রার্থী নির্বাচনের জন্য প্রতি পর্বে গঠন করা হয় ২২ থেকে ২৪টি আলাদা বোর্ড, এই বোর্ডের নির্বাচক হিসেবে থাকেন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সামরিক কর্মকর্তারা। মনোবিজ্ঞানী, দল অভীক্ষা কর্মকর্তা (গ্রুপ টেস্টিং অফিসার) এবং প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি প্রেসিডেন্টরা ত্রিমাত্রিক কৌশলে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করেন।
প্রথম দিনের কার্যক্রম
নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক নির্বাচন ও লিখিত পরীক্ষা পাস করে যাঁরা আইএসএসবিতে যাবেন, তাঁদের প্রথম দিন সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে উপস্থিতি নিশ্চিত (রিপোর্ট) করতে হবে। এরপর তাঁদের নিয়ে একটি স্বাগত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চার দিনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়। প্রথম দিনের সকালে বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা (আইকিউ পরীক্ষা) এবং চিত্র প্রত্যক্ষকরণ ও বর্ণনাকরণ পরীক্ষার (পিপিডিটি) মাধ্যমে সকালের কার্যক্রম শেষ হয়। সকালের পরীক্ষায় যাঁরা বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় সফল হন, তাঁরা পরবর্তী পরীক্ষা (পিপিডিটি) পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন, বাকিরা বিদায় নেন। প্রথম দিন বিকেলে প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেবেন। প্রথম দিন সকালের পর আর কাউকে বাদ দেওয়া হয় না। বাকিরা পরবর্তী তিন দিনের পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন।
বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা
বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা হয় বাচিক (ভার্বাল) এবং অবাচিক (নন-ভার্বাল) এই দুই ধরনের। এমসিকিউ ধরনের এবং এমআর প্রশ্নে হবে এ পরীক্ষা। থাকে নির্ধারিত সময় বরাদ্দ। বাচিক পরীক্ষায় সত্য-মিথ্যা, বিভিন্ন সিরিজ, অসাদৃশ্য, গাণিতিক প্রশ্ন করা হয়। আর অবাচিক পরীক্ষায় নানা ছবি বা চিহ্ন এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক চিত্র দিয়ে প্রশ্ন হয়ে থাকে। যাঁরা নূ্যনতম পাস নম্বর পাবেন না, তাঁদের এখান থেকে বিদায় নিতে হবে।
চিত্র প্রত্যক্ষকরণ ও বর্ণনাকরণ পরীক্ষা
এ পরীক্ষায় আংশিক অস্পষ্ট চিত্র প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয় এবং সেই ছবি দেখে প্রার্থীদের কল্পনামতো গল্প লিখতে বলা হয়। এরপর নির্বাচক মণ্ডলীর উপস্থিতিতে প্রার্থীরা নিজেদের লেখা গল্প নিয়ে দলগত আলোচনা করবে। সবশেষে ফল প্রকাশের মাধ্যমে বাদ যাবে আরো কিছু প্রার্থী।
ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা
প্রথম দিনের বিকেলে প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীদের মনস্তাত্তি্বক দিক উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব যাচাই করা হয়। এ পরীক্ষায় প্রার্থীরা বাংলা ও ইংরেজিতে বাক্য সমাপনী, ইংরেজিতে বাক্য রচনা, ছবি দেখে গল্প রচনা (বাংলা ও ইংরেজি), বায়োডাটা, আত্মসমালোচনা, সংবাদ রচনা, সমকালীন বিষয়ে প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষা
দ্বিতীয় দিন সকালে দলগত পরীক্ষার জন্য সাত-আটজনকে নিয়ে আলাদা দল গঠন করা হয়। নির্বাচক থাকবেন দল-নিরীক্ষা কর্মকর্তা (জিটিও)। এ পরীক্ষার মাধ্যমে দলগত কাজের ক্ষমতা ও শারীরিক দক্ষতা যাচাই করা হবে। দলগত আলোচনা পর্বে বাংলা ও ইংরেজিতে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে হয়। এরপর প্রগ্রেসিভ গ্রুপ টাস্ক (পিজিটি) পর্বে একটি দলকে চারটি বাধা পর্যায়ক্রমে পার হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অর্ধ দলগত কাজ (এইচজিটি) গঠিত হয় তিন-চারজন প্রার্থীকে নিয়ে। এখানে একটি বাধা অতিক্রম করতে হয়। এরপর প্রার্থীদের ইংরেজিতে উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিতে হয়। দ্বিতীয় দিন সকালের সর্বশেষ পরীক্ষা হচ্ছে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা। এতে একজন প্রার্থীকে আটটি শারীরিক পরীক্ষা দিতে হয়। আটটি বিষয় হলো দীর্ঘ লম্ফ, জিগজাগ, ওয়াল জাম্প, উচ্চ লম্ফ, বার্মা সেতু, টারজান সুইং, রশি আরোহণ, ঝুলন্ত কাঠের গুঁড়ি। দ্বিতীয় দিন বিকেলে প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য একে একে ডাকা হয়। মুক্ত ও অবাধ এ সাক্ষাৎকারে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যাদি, পারিবারিক তথ্য, শখ, ঐকান্তিক ইচ্ছা, নিজ জেলা ও তার ঐতিহ্য, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, ইংরেজিতে দক্ষতা, শিক্ষাগত তথ্য জানা হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনার বিশ্লেষণও করতে বলা হতে পারে। এ সাক্ষাৎকারে দায়িত্বে থাকেন একজন ডেপুটি প্রেসিডেন্ট। এ সাক্ষাৎকালের ফলাফলের ওপর প্রার্থীর সফলতা অনেকখানি নির্ভর করে।
তৃতীয় দিনের কার্যক্রম
তৃতীয় দিন সকালের পরীক্ষাগুলো হচ্ছে পরিকল্পনাকরণ (প্ল্যানিং এঙ্ারসাইজ)। এখানে একটি গল্পের মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা দেওয়া থাকে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হয়। এরপর থাকে নেতৃত্বের কাজ (কমান্ড টাস্ক)। এতে প্রত্যেক সদস্যকে তিন-চারজনের একটি গ্রুপের দলনেতা বানানো হয়। তাকে পুরো দল নিয়ে একটি বাধা নির্দিষ্ট সময়ে অতিক্রম করতে হয়। এরপর পারস্পরিক সমঝোতা মূল্যায়ন (মিউচ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট) এ প্রার্থীদের বিচারিক ক্ষমতা যাচাই করা হয়। এতে প্রার্থী তাঁর নিজেকেসহ অন্যদের সেরা তালিকা তৈরি করবেন। তালিকায় নিজেকেসহ দলের সবাইকে তাঁর দক্ষতার ভিত্তিতে নম্বর দিতে হবে। দ্বিতীয় দিন যাঁদের সাক্ষাৎকার হয়নি তাঁদের সাক্ষাৎকার তৃতীয় দিন বিকেলে শেষ করা হয়।
শেষ দিনের কার্যক্রম
শেষ দিন কোনো পরীক্ষা থাকে না। নির্বাচকদের সবাই মিলে প্রত্যেক প্রার্থীর তিন দিনের কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন করে নির্বাচিত ও প্রত্যাখ্যাতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁদের দেওয়া হয় সবুজ কার্ড। আর প্রত্যাখ্যাতদের লালকার্ড।
চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
আইএসএসবিতে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষায় যাঁরা সফল হন, কেবল তাঁরাই চূড়ান্তভাবে নিয়োগ পান।








