জাতিসংঘ ভবনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের প্রবেশ পথের দেয়ালে একটি কাচের শোকেসে 'নীলপদ্ম' এখন শোভা পাচ্ছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য প্রাপ্তির রজতজয়ন্তী উপলক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ফলক'টি উপহার দেন।
শিল্পকর্মটি গ্রহণকালে তিনি সেদিন এমন মন্তব্য করেন। 'নীলপদ্ম' হচ্ছে অষ্টম শতাব্দীর একটি পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা)। ১৯৫৫-৫৬ সালে কুমিল্লা জেলার ময়নামতি শালবন বিহারে এক প্রত্নতাত্তি্বক খননকালে এটি পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্তি্বক খননের ফলে শিল্পসমৃদ্ধ আরও পোড়ামাটির ফলক পাওয়া যায়। তবে শালবনে প্রাপ্ত এই ফলকটি ছিল অসাধারণ। সম্ভবত মন্দিরের বহিরাঙ্গ অলঙ্করণের জন্য ফলকটি তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশে পোড়ামাটির শিল্প সামগ্রী গড়ে ওঠার পেছনে আছে এক চমৎকার ইতিহাস। আদিকাল থেকে এ ব-দ্বীপ অঞ্চলে শিল্পের সবচেয়ে সুন্দর ও সার্বজনীন মাধ্যম ছিল কাদামাটি। তখন থেকেই এদেশে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র, সমৃদ্ধ ও ধারবাহিক শিল্পরীতি। পোড়ামাটির শিল্পদ্রব্য সাধারণ মানুষ যেমন তাদের গৃহস্থালী কিংবা ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করত, তেমনি শিল্পীদের সৃষ্টি আকাক্সক্ষাকেও পূরণ করত। কাদামাটির এই শিল্পরীতি প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত, এমনকি উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। তবে কাদামাটির এই শিল্পদ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল পোড়ামাটির ফলক। এসব ফলকে সব শ্রেণীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনচিত্র শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলতেন। তাছাড়া জীবজন্তু ও প্রকৃতির নানা দৃশ্য মৃৎশিল্পীরা নিপুণভাবে এসব ফলকে ফুটিয়ে তুলতেন। 'নীলপদ্ম টেরাকোটা'টির নির্মাণশৈলী ও শিল্পবোধ ছিল বিস্ময়কর। স্বর্গের ফুল হিসেবে গণ্য পদ্মফুলকে অসাধারণ দক্ষতায় শিল্পী এই পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এর কারুকাজ অনন্য, শিল্পভাবনা অতুলনীয়। সম্ভবত রাজপৃষ্টপোষক কোনো শিল্পীর অসাধারণ সৃষ্টি এই নীলপদ্ম টোরাকোটাটি। অতীত গৌরবগাথা এই টেরাকোটাটি আজ সুদূর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে বাংলাদেশের সৌরভ ছড়াচ্ছে।
স্বপন কুমার দাস








