আশীষ-উর-রহমান
ছবির ক্যাপশনটি পরিষ্কার বাংলায় নিজেই বললেন শিল্পী মিগেল অলিভার: ও মাঝি ভাই, আমারে পার করবানি। খোলা ছবির খাতা। তাতে দুই পাতা জুড়ে আবহমান বাংলার এক চিরচেনা ছবি। একপাশে নৌকা বেয়ে যাচ্ছে মাঝি, অন্যপাশে নদীতীরে দাঁড়িয়ে হলুদ শাড়ি পরা গাঁয়ের বধূ। মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ছবির খাতাটি ফেলে রাখা প্রায় শূন্য এক টেবিলের ওপর। যেন ধু ধু শূন্য প্রেক্ষাপটে তার অস্তিত্বকে একটি বিশেষ অবস্থায় প্রকাশ করছে। স্পেনের চিত্রকর মিগেল যমুনা নদীর তীরে এমন এক দৃশ্য দেখেই আঁকেন ছবিটি।
মিগেল অলিভার প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০০৯ সালে। বেশ কয়েক মাস ছিলেন। সে সময়েই এ দেশের নদী-নিসর্গ, মরিচের ঝালে মাছের ঝোল, লোকসংগীত আর মানুষের আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই টানেই এ মাসের প্রথম সপ্তায় আবার বাংলায় ফেরা। এবার ঘুরেছেন নিজের ইচ্ছেমতো। বরিশাল থেকে শুরু করে পাবনা, গারো পাহাড় আর ঢাকা শহরের বিস্তর গলি থেকে রাজপথ। যা চোখে পড়ল, মনে দাগ কেটে গেল। এরই কিছু কিছু ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যানভাসে, তেল রং ও অ্যাক্রেলিকে। এসব ছবি নিয়েই তাঁর একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে আজ শনিবার থেকে গ্যালারি চিত্রকে (ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর বাড়ি)। বিকেল পাঁচটায় এর উদ্বোধন করবেন আসাদুজ্জামান নূর। প্রদর্শনীর নাম ‘ভুলো না আমায়’। চলবে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাদেশের নদ-নদী মন কেড়েছে মিগেলের। প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবিও নদী, মাছ ধরা, মাঝিদের নৌকা বেয়ে চলা ইত্যাদি নিয়ে। নদীর সঙ্গে এ দেশের মানুষের বিভিন্ন পর্যায় ও পরিপ্রেক্ষিতে জীবন যাপনের যে গভীর সংযোগ, সেটি খুব সহজেই ধরতে পেরেছেন তিনি। একেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর আছে প্রান্তিক মানুষ।
মিগেলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল চিত্রকের উঠানে। তিনি স্প্যানিশেই বলছিলেন। ভাবের আদান-প্রদান চলছিল শিল্পী শহীদ কবিরের ভাষান্তরে। শহীদ কবিরের মাধ্যমেই এ দেশের সঙ্গে মিগেলের যোগাযোগ। শিল্পশিক্ষাও। শহীদ কবির সেই ঘটনাটি বললেন। ১৯৮৯ সালে কবির কাজ করছিলেন মাদ্রিদের ‘রেপ্রো আর্টএচিং এডিটোরিয়াল’ নামের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। মিগেল সেখানে একদিন হাজির তাঁর কতগুলো ড্রয়িং নিয়ে। বক্তব্য—শিল্পশিক্ষা করবেন। লাইন দেখেই কবির বুঝলেন, মিগেলের হবে। ভর্তি করে নিলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা স্থাপত্যবিদ্যায় হলেও পেশাগতভাবে স্থাপত্যচর্চায় পরে আর আগ্রহ বোধ করেননি মিগেল অলিভার। প্রবল অনুরাগ জন্মে চিত্রকলায়। ‘রেপ্রো আর্ট এচিং এডিটোরিয়ালে’ শিল্পকলার চর্চা করতে গিয়ে শহীদ কবিরের সঙ্গে গভীর হূদ্যতা। সেই সূত্রেই বাংলাদেশে আসা। মিগেল এখন পুরোদমে চারুকলার চর্চাই করছেন। স্পেন, বেলজিয়াম, কোস্টারিকা, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে তাঁর শিল্পকর্মের বেশ কয়েকটি একক প্রদর্শনী হয়েছে। যৌথ প্রদর্শনী হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ঢাকায় হচ্ছে এই প্রথম।
মিগেল কবিতা ভালোবাসেন। রবীন্দ্রনাথেরও একটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন তিনি। ঢাকায় এসে রবীন্দ্রসংগীত শুনেছেন। তবে তাঁর মন ভরিয়ে দিয়েছে লোকসংগীত। কাঙ্গালিনী সুফিয়ার কাছে শোনা লালনের ‘অপার হয়ে বসে আছি’ গানটি গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে তাঁর অন্তর। মনে হয়েছে, এসব গানের মধ্যে এ অঞ্চলের আত্মার স্পন্দন আছে।
মিগেল গতবার এসে মাস খানেকের মতো ছিলেন গারো পাহাড়ে। গারোদেরও ছবি এঁকেছেন তিনি। আছে কিছু স্থির জীবনচিত্র। তাতে আছে থালায় রাখা সাদা ভাত। বরিশালের মৃগেল মাছের ঝোল তাঁর মুখে লেগে আছে। তবে এ দেশের সবই যে ভালো লেগেছে তা নয়। খুব কষ্ট পেয়েছেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে খালি পায়ে হাঁটতে দেখে। বুঝেছেন সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের মাত্রা। বিস্মিত হয়েছেন রাজপথে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মানুষের লাশ পড়ে থাকতে দেখে।
এতদসত্ত্বেও এই দেশটিকে নিয়ে তাঁর মুগ্ধতা কাটেনি। আরও অনেকবার এখানে আসার ইচ্ছা আছে তাঁর। ভাবছেন, অন্য ধরনের কিছু করা যায় কি না, যাতে সাধারণ মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হয়। শুধু এলেন, দেখলেন, ছবি আঁকলেন আর চলে গেলেন—এর মধ্যেই সীমিত রাখতে চান না বাংলার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা।








