আশাবাদী, তবে ভয়ও পিছু ছাড়ছে না
একসময় বাংলাদেশ বলতেই বোঝাত তিন দ—দারিদ্র্য, দুর্যোগ ও দুর্নীতি। ক্রমেই বাংলাদেশের সেই ইমেজ বদলাচ্ছে। কথাটা বোঝানোর জন্য ২০ বছর আগের একটি ঘটনার কথা বলি। তখন আমি সদ্য আমেরিকায়, দেশটাকে ঠিকমতো বোঝাও হয়ে ওঠেনি। একদিন টিভিতে দর্শকের উপস্থিতিতে লাইভ টক শো দেখছিলাম। তাতে ঠাট্টা-তামাশা করতে হাজির ছিলেন রোজান বার, এ দেশের নামজাদা কমেডিয়ান। আয়তনে তিনি ছোটখাটো একটি জলহস্তী, চেঁচিয়ে তারস্বরে কথা বলেন। এ দেশের টিভির দর্শক তাঁকে দেখলেই হাসে, কেন হাসে তা বোঝা অবশ্য আমার বুদ্ধির অগম্য।
তো, সেই রোজান চুটকি বলছিলেন। দুই দিন আগে তিনি নাকি চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন পরামর্শ নিতে, কী করলে তাঁর ওজন কমবে। চিকিৎসকের উত্তর: মাস খানেক বাংলাদেশে কাটিয়ে আসুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। সে কথা শুনে হলভর্তি মানুষজন হেসে কুটি কুটি। আমি বুঝে পাই না, এতে হাসির কী হলো! পরে, অনেক পরে বুঝেছিলাম, ওই বাংলাদেশের নাম শুনেই সবাই হাসছে। দেশটা এমন গরিব, সেখানে খাদ্যের এমন ঘাটতি যে রোজান এক মাস সেখানে কাটালে না খেয়েই তিনি শুকিয়ে দড়ি দড়ি হয়ে যাবেন।
সম্প্রতি আমার এক মার্কিন সহকর্মীকে, তাঁর সঙ্গে বাসায় ফেরার পথে, এ গল্পটা শোনালাম। গল্প শুনে তাঁর প্রশ্ন, এতে হাসির ব্যাপারটি কী? আমি ভেঙে বলায় তাঁর মন্তব্য—ফালতু গল্প, এ গল্পের কোনো মানেই হয় না। বাংলাদেশ দারফুর বা সোমালিয়া নয়। বাংলাদেশে না গিয়ে রোজান ওসব দেশে গেলেই বরং বেশি ভালো ফল পাবেন।
মার্কিন সাংবাদিক-লেখক ওয়ালটার লিপম্যান একসময় বলেছিলেন, ‘আমাদের মাথার মধ্যে কিছু কিছু ছবি সাঁটা থাকে। এই ছবিগুলো তৈরি হয় মূলত তথ্যমাধ্যমের হস্তক্ষেপে। পত্রপত্রিকায়, রেডিও-টিভিতে একই ছবি দেখতে দেখতে বহির্গত কোনো বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের মনের মধ্যে একটা ধারণা আসন গেড়ে বসে। যখনই সে বাস্তবতার প্রসঙ্গ ওঠে, অমনি আমাদের মাথার মধ্যে পুষে রাখা সেই ছবি লাইট বাল্বের মতো জ্বলে ওঠে। ধরা যাক, হলিউড। যখনই আমরা এই শব্দটা শুনি, অমনি মাথার মধ্যে ভাসে স্বল্পবসনা সুন্দরী, ঝাঁ-চকচকে গাড়ি, গ্লামার। অথবা আফ্রিকা, এই নাম শুনলেই আমরা ভাবি দারিদ্র্য-পীড়িত, দুর্ভিক্ষ-আক্রান্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন এক মহাদেশের কথা। বাংলাদেশের ব্যাপারটাও তা-ই। বারবার পত্রপত্রিকায় বা টিভিতে আমরা এই দেশ নিয়ে একই ছবি দেখেছি, একই কথা শুনেছি। ফলে অনেকের বা অধিকাংশের মাথার মধ্যে বাংলাদেশ বলতে ওই তিন ছবি বোঝায়। সত্য-মিথ্যা, ঠিক-বেঠিকের কথা তুলছি না। আমি শুধু ওই ‘পিকচার ইন দি হেড’-এর কথা বলছি। একবার সে ছবি মাথার ভেতর স্থান নিলে তা বদলানো খুব কঠিন।’
মাথার মধ্যে যে ছবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবতা-বিবর্জিত নয়। হলিউড বললে যে আমরা স্বল্পবসনা সুন্দরীদের কথা ভাবি, তার কারণ সত্যি সেখানে স্বল্পবসনা সুন্দরীদের মেলা, যদিও সেটাই হলিউড নিয়ে একমাত্র সত্য নয়, বাস্তবতার সেটি একমাত্র চিত্রও নয়। বাংলাদেশ নিয়ে যে বিদেশিদের মাথায় একটা ধরাবাঁধা চিত্র আসন গাড়া আছে, তার কারণ আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে তা খুব দূরত্বে অবস্থিত নয়। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশ মানে শুধু এই তিন ‘দ’ নয়। দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ ও দুর্নীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের রয়েছে ধনী সাহিত্য ও সংস্কৃতি, রয়েছে গণতান্ত্রিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অব্যাহত সংগ্রামের ইতিহাস, রয়েছে তার মুক্তিযুদ্ধ। অন্য সবকিছু ছাপিয়ে শুধু ওই তিন সত্য মাথার ভেতর জেঁকে বসার কারণ প্রতীক হিসেবে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী, অন্য আর সবকিছুই তাদের পাশে ম্লান হয়ে যায়।
আমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ, ধীরে ধীরে বাংলাদেশ নিয়ে এই ছবি বদলাতে শুরু করেছে।
দেশটা অভাবী, এ কোনো নতুন কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে অভাবের সমার্থক হিসেবে এখন সবাই আর দেখে না। বরং উল্টো, দারিদ্র্যমোচনে তার সাহসী উদ্যোগ বিশ্বসভায় প্রশংসিত হয়েছে। শিশুমৃত্যু রোধে তার সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ পুরস্কৃত হয়েছে। দুর্যোগ থেকেও বাংলাদেশ রেহাই পায়নি, কিন্তু গত ২০ বছরে আমরা এমন কোনো দুর্যোগকবলিত হইনি যে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমাদের বিশ্বসভায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। বরং উল্টো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, বিশেষত তার ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’কে উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বন্যার সময় তাদের প্রস্তুতিহীনতা বোঝাতে বাংলাদেশের সাফল্যের উদাহরণ এসেছে। তিন ‘দ’-এর শেষ দ—দুর্নীতি, তা বাংলাদেশের জন্য এখনো বড় সমস্যা বটে। বছর দশেক আগেও পৃথিবীর এক নম্বর দুর্নীতিবাজ বলতে যেমন বোঝাত বাংলাদেশ, এখন আর তা কেউ বলে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের অঙ্ক সামান্য হলেও বদলাতে বাধ্য হয়েছে। এই তিন ‘দ’-এর বাইরেও কিছু ছবি আছে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের নাম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। পাঁচ-সাত বছর আগেও বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে নানা উদ্বেগজনক কথা শুনেছি, বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশকে ‘কুকুন অব টেরর’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। মৌলবাদের হুমকি একেবারে মিটে যায়নি, কিন্তু সেখানে মৌলবাদী উত্থানের উদ্বেগ এখন আর খবরের শিরোনাম নয়। বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বা প্রায়-ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে তত্ত্বকথা আওড়ানো হয়েছে। কই, এখন সে কথাও আর শুনি না।
আমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ, পুরোনো বাস্তবতা বদলে নতুন, ভিন্ন রকমের বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে বাংলাদেশ। মাথার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নতুন ছবি।
কী সেই ছবি, তা বোঝার জন্য আমি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে ব্যারোমিটার হিসেবে ব্যবহার করব। ১০-১৫ বছর আগেও এই পত্রিকা অনুন্নয়ন ও পশ্চাৎপদতার উদাহরণের প্রয়োজন পড়লে পুরোনো দেরাজ খুঁজে বাংলাদেশকে তুলে আনত। হারলেমে শিশুমৃত্যুর হার মাত্রাতিরিক্ত, কিন্তু অবস্থা কতটা খারাপ, তা বোঝাতে বলতে হতো, এমনকি বাংলাদেশেও হারলেমের চেয়ে শিশুমৃত্যুর হার কম। অস্ট্রেলিয়ার কোনো এক শহরে সুপেয় জলের মান হঠাৎ খুব পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে মান কতটা খারাপ তা বোঝাতে বলতে হতো, এমনকি বাংলাদেশের চেয়েও তা খারাপ। আমেরিকার বহিরাগত মৌসুমি শ্রমিকদের বেতন কী ভয়াবহ রকম অল্প এবং তারা কী রকম শোষণের শিকার তা বোঝাতে বলতে হতো, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের চেয়েও তাঁদের বেতন কম। সোজা কথায়, যা কিছু খারাপ, তার ‘পোস্টার চাইল্ড’ ছিল বাংলাদেশ।
এবার দেখা যাক, সাম্প্রতিক সময়ে এই পত্রিকা বাংলাদেশ নিয়ে বড় কী কী খবর দিয়েছে। পদ্ধতিটি খুবই অবৈজ্ঞানিক, কিন্তু মোদ্দা ছবিটা বোঝার জন্য তা একদম অর্থহীন নয়। কোনো বিশেষ ক্রমিক হিসেবে নয়, টাইমসের ওয়েবসাইট থেকে যেমন সার্চ রেজাল্ট পেয়েছি, তা তুলে ধরছি:
১. ক্রসফায়ার (দৃক গ্যালারিতে শহীদুল আলমের একক চিত্র প্রদর্শনীর বিবরণ ও কমেন্টারি)
২. গার্মেন্টস শিল্প (মেয়েদের কর্মসংস্থানের ফলে সমাজে মেয়েদের ভূমিকা দ্রুত বদলে যাচ্ছে)
৩. অভিবাসন (সুইডেনে আটকে পড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্ভোগ)
৪. গার্মেন্টস শিল্প (শ্রমিকদের বেতন তুলনামূলকভাবে অল্প হওয়ায় চীনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বাংলাদেশ)
৫. উষ্ণায়ন (পরিবেশসংকটের ফলে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে, উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে)
৬. মুক্তিযুদ্ধ (মুক্তিযুদ্ধে মেয়েদের নির্যাতন এখনো অনালোচিত বিষয়)
৭. উদ্বাস্তু (বাংলাদেশে বার্মিজ উদ্বাস্তুরা নির্যাতিত হচ্ছে)
৮. গার্মেন্টস শিল্প (পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি)
৯. গার্মেন্টস শিল্প (ধর্মঘটের কারণে শ্রমিক গ্রেপ্তার)
১০. আর্সেনিক (পানিতে আর্সেনিক বিষ থাকায় বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে)।
ওপরের ১০টি খবরের যে শিরোনাম-তালিকা, তা ভালো নয়, খারাপও নয়। বাংলাদেশ না হয়ে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এমন যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই তারা সংবাদ শিরোনাম হতে পারত, এ নিয়ে ভ্রু কোঁচকানোর কিছু নেই। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এই যে গুণগত পরিবর্তন, তা আসলে বাংলাদেশ যে নিজেই ভেতর থেকে ক্রমেই একটু একটু করে বদলাচ্ছে, তার প্রমাণ। বাংলাদেশের ভেতর যাঁরা থাকেন, অসহনীয় দৈনন্দিন সংকট মাথায় নিয়ে যাঁরা দিন যাপন করেন, তাঁরা আমার এ কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন। ‘দিনে ১০ বার লোডশেডিং, অসহ্য যানজট, পানি ও গ্যাসের জন্য হাহাকার, এসব যদি সহ্য করতে হতো, তাহলে আর আশার বাতি জ্বালাতে হতো না’, তাঁরা এমন মন্তব্য করছেন তা আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের এই দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি সরানো আমার লক্ষ্য নয়। কিন্তু দেশটির এটাই একমাত্র বাস্তবতা নয়, আমি শুধু এ কথাটাই বলতে চাই। আন্তর্জাতিক তথ্যমাধ্যম এই ভিন্ন বাস্তবতাসমূহের একটা মোদ্দা ছবি দেওয়া শুরু করেছে। ফলে মাথার ভেতরের ছবিগুলোও বদলাতে শুরু করেছে।
আমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সে অর্জন করছে। গত তিন-চার বছর বিশ্ব এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করছে। এই মন্দাবস্থার শিকার হয়ে ইউরোপে ও আমেরিকায় একের পর এক সরকারের পতন হয়েছে। গ্রিস, আইসল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালে নাগরিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তা সামলাতে কোথাও কোথাও পুলিশ নামাতে হয়েছে। আমেরিকায় নাগরিক অসন্তোষের কারণে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক দল আইন পরিষদের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে, এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই যে টালমাটাল অবস্থা, তার ভেতর বাংলাদেশকে রীতিমতো স্থিতিশীল মনে হয়।
আমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী। কারণ, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের পথে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।
গণতন্ত্র একটা বহুতল ভবনের মতো, তাকে একদম মাটির নিচ থেকে একটা একটা ইট দিয়ে গড়তে হয়। আমরা সেই কাজটিই করে চলেছি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে অর্থনীতি এগোলে দেশ এগোয়। কারণ, সেসব দেশে রাজনীতি হলো অর্থনীতির সম্প্রসারণ। বাংলাদেশে ব্যাপারটি উল্টো, সেখানে রাজনীতিটাই মুখ্য। আমরা জানি, বাংলাদেশ তার ইতিহাসের প্রথম ২০ বছর চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ, বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা—এই পাপচক্রে বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগই পায়নি। অবস্থা বদলানো শুরু হলো ১৯৯০ সালে, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকে। কখনোসখনো বেসামাল মনে হলেও এই ২০ বছর মোটের ওপর পা দেখে, পথের কাঁটা এড়িয়ে সে চলেছে। যত বেশি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আয়োজন সম্ভব হবে, গণতন্ত্রের বহুতল ভবনটি তত মজবুত হবে। নির্বাচনের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল সম্ভব, এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে অগণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংবিধানবহির্ভূত পথে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারাও কমে আসবে।
আমি বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী, কিন্তু ভয়ও আমার পিছু ছাড়ে না।
গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের মানুষ বহু পরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, একের পর এক পরীক্ষা আমরা দিয়েছি, সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছি। একেকটি বিজয় যেন একেকটি স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে চলা। এত যে রক্তক্ষয় ও আত্মত্যাগ, তার পরেও আমাদের সিঁড়ি ভাঙা থামে না। যাঁদের বিশ্বাস করে দেশ শাসনের চাবি আমরা তুলে দিই, আঘাতটা আসে তাঁদের কাছ থেকেই। দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক বিজয়ের ফল নিজেরা যতটুকু ভোগ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভোগ করেছেন ক্ষমতালোভী রাজনীতিকেরা। বঙ্গবন্ধু তাঁদের বলতেন ‘চাটার দল’। এসব লোভী ও স্বার্থপর মানুষের কারণে আমরা বারবার ঠকেছি। আবারও না ঠকি, এই ভয় আমাদের পিছু ছাড়ে না।
কিন্তু একা রাজনীতিকদের দোষ দেওয়া বোকামি। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন শেষ হলে আমরা ধরে নিই, নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শেষ। কথাটা ভুল। কারণ, আরিয়ানা হাফিংটনের কথা ধার করে বলতে পারি, গণতন্ত্র ঠিক ‘স্পেকটেটর স্পোর্ট’ নয়। রাজনীতিবিদেরা মাঠে খেলবেন, আমরা গ্যালারিতে বসে হাততালি দেব বা দুয়ো দুয়ো করব, ব্যাপারটা মোটেই সে রকম নয়। যে দেশে নাগরিকগোষ্ঠী স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার সম্পাদনের সকল ক্ষেত্রে যত বেশি সক্রিয়, সে দেশে গণতন্ত্র তত মজবুত। একমাত্র অংশগ্রহণের মাধ্যমেই দেশের মানুষ রাজনৈতিক ও উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় নিজের মালিকানা—তার ওনারশিপ অর্জন করে। রাজনৈতিক দল ও তার কর্মসূচিতে তো বটেই, স্থানীয় স্কুল, বোর্ড, লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা বা বনায়নের মতো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে নাগরিক অংশগ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি এখনো দুর্বল। অনুমান করি, পেশাদারি রাজনীতিকদের পেশিবল ও অর্থবলে ভীত হয়ে মানুষ অংশগ্রহণবিমুখ হয়। এ পরিস্থিতি বদলানোর জন্য প্রয়োজন সুশীল সমাজের সম্প্রসারণ। সুশীল সমাজ মানে সরকারের লেজুড় ধরা এনজিও বাহিনী নয়। ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থেকে যারা বিভিন্ন স্থানীয় বা জাতীয় প্রশ্নে—যেমন নারী অধিকার, পরিবেশ উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী স্বার্থ, স্বচ্ছ নির্বাচন ইত্যাদি—জনমত সংগঠিত করে সরকারের ওপর চাপ দেয়, আমি তেমন নাগরিক গোষ্ঠীসমূহের কথা বলছি। গণতন্ত্রকে পেশাদার রাজনীতিকের রাহুমুক্ত করতে হলে সুশীল সমাজের ব্যাপকতর অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা থামাইনি। কারণ, সে স্বপ্ন হারিয়ে গেলে আমরাই হেরে যাব।








