কমলায় রঙিন পঞ্চগড়, উৎফুল্ল চাষিরা
আটোয়ারীর জুগিকাটা গ্রামের সাজেদুর রহমানের বাগান হলুদ কমলায় বর্ণিল
পাকা কমলায় ভরে গেছে গাছের শাখা-প্রশাখা। দুই শ থেকে এক হাজার পর্যন্ত কমলা ধরেছে একেকটি গাছে। কমলার রঙে রঙিন হয়ে আছে কমলার বাগানগুলো। এ দৃশ্য দেখা যাবে পঞ্চগড়ে। কমলার এমন ফলনে উৎফুল্ল চাষিরা।
স্থানীয় কমলাচাষিদের ভাষ্যমতে, পঞ্চগড়ে উৎপাদিত কমলা আকার, রং ও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। অনেকেই পঞ্চগড়ের কমলাকে ভারতের দার্জিলিংয়ের কমলার সঙ্গে তুলনা করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা কমল কুমার সরকার বলেন, পঞ্চগড়ে উৎপাদিত কমলার রং, আকার, স্বাদ ভারতীয় কমলার মতো।
উল্লেখ্য, পঞ্চগড়ে শুধু খাসিয়া জাতের কমলার চাষ হয়।
যেভাবে শুরু: আট-দশ বছর আগের কথা। অনেকটা শখেরবশে জেলার অনেক মানুষ বাড়ির পাশের খালি জায়গায় কমলার চারা লাগান। কয়েক বছর পরেই সেসব গাছে কমলা ধরতে শুরু করে। তা দেখে উৎসাহিত হয় আশপাশের লোকজন। এভাবে বাড়তে থাকে চাষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সারা দেশে কমলা চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ২০০৩ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে কৃষি মন্ত্রণালয়। টাস্কফোর্স পঞ্চগড়ের সদর, তেঁতুলিয়া, বোদা ও আটোয়ারী উপজেলার মাটি কমলা চাষের উপযোগী বলে মত প্রকাশ করে। ২০০৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জেলায় কমলার চাষ শুরু হয়। এরপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে অনেক বাগান গড়ে ওঠে। জেলার ২১২ একর জমিতে ২২৩টি কমলা বাগান গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বসতবাড়ি ও বাগানের সাত হাজার গাছে কমলা ধরেছে।
কমলা উন্নয়ন প্রকল্প: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০০৬-১১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে জেলায় কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। পাঁচ বছরে প্রকল্পের অধীনে ২২৩টি বাগানে ৩৪ হাজার ৮৮৮টি কমলার চারা রোপণ করা হয়। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে রোপণ করা হয় এক লাখ ৫৬ হাজার চারা। প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার কমলাচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় ২৫ মেট্রিক টন কমলার উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী মৌসুমে জেলায় ৫০০ মেট্রিক টন কমলা উৎপাদন হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
গত জুনে কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এতে কমলাচাষিদের কারিগরিসহ নানা সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
কমলাচাষিরা বলেন, কমলা উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত জুন মাস থেকে তাঁরা কোনো কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন না। কোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে কারও কাছে কোনো সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না।
কর্মকর্তার বক্তব্য: কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তা কমল কুমার সরকার বলেন, কমলা চাষের পদ্ধতিকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: পুরোনো গাছের পরিচর্যা, বসতবাড়ির আশপাশে প্রদর্শনী প্লট ও বাগান প্রদর্শনী। ইতিমধ্যে পুরোনো এক হাজার গাছের পরিচর্যা করা হয়েছে। তিনি জানান, কমলার চারা সরবরাহের জন্য একটি নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। ওই নার্সারিতে উৎপাদন করা হয় দুই লাখ চারা।
কমলা উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই নার্সারির কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নার্সারির ২০ হাজার চারা নষ্ট হওয়ার পথে বলে জানা গেছে।
কমল কুমার সরকার জানান, শীত বেশি হওয়ায় পঞ্চগড় কমলা চাষের জন্য অনুকূল। পঞ্চগড়ের কমলা সিলেটের কমলার চেয়ে ভালো। তিনি জানান, ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কমলার গাছে ফলন ধীরে ধীরে বাড়ে। ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে এবং ২৫-৫০ বছর পর্যন্ত ফলন আস্তে আস্তে কমে আসে।
কমল কুমার সরকার বর্তমানে ঢাকার খামারবাড়ীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে কর্মরত।
লাভের অঙ্ক: কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ৭৮টি কমলার চারা রোপণ, কীটনাশক, শ্রমিক ও সার বাবদ খরচ পড়বে ২৫ হাজার টাকা। চতুর্থ-পঞ্চম বছরে প্রতিটি গাছে ২৫০টি হিসাবে ১৯ হাজার ৫০০টি কমলা উৎপাদন হবে। প্রতিটি কমলা কমপক্ষে ১৫ টাকা হিসাবে বিক্রি করা যাবে দুই লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকায়। এ ছাড়া কমলার বাগানে সাথি ফসল আবাদ করেও অতিরিক্ত টাকা আয় করা সম্ভব।
সাফল্য: বোদা উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের বাচ্চু মিয়া ৮-১০ বছর আগে শখেরবশে তিনটি কমলার চারা লাগিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে ফল পাননি। ২০০৭ সালে কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সাত দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ওই তিনটি গাছের পরিচর্যা করেন। পরের বছরই গাছে ফলন আসে। এরপর প্রতিবছর ফলন বাড়তে থাকে। এবার তিনটি গাছে প্রচুর ফল ধরেছে। তিনি জানান, ৫০টি গাছের একটি বাগান করেছেন তিনি। ওই বাগানের গাছেও ফল আসতে শুরু করেছে।
আটোয়ারী উপজেলার পানিশাইল গ্রামের আবদুর রশিদ ১০০টি গাছের কমলা বাগান করেছেন। এবার বেশ কিছু গাছে ফলন এসেছে। তিনি জানান, এবারের মৌসুমে ৩০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। আগামী মৌসুমে এক লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন। একই উপজেলার জুগিকাটা গ্রামের সাজেদুর রহমানের বাগানটি ৪০টি গাছ নিয়ে। এর মধ্যে ১০টিতে ফল ধরেছে।
সদর উপজেলার বামনপাড়া গ্রামের হাবিবুন্নবী প্রধান ৪০০টি গাছের বাগান করেছেন। এবার অল্প পরিমাণে ফলন হয়েছে। ভবিষ্যতে ব্যাপক ফলন আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
জেলায় এ রকম শতাধিক কমলাচাষির বাগানে খাসিয়া জাতের কমলা ধরতে শুরু করেছে।
প্রয়োজন সহায়তা: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কমল কুমার সরকার বলেন, পঞ্চগড়ের জন্য কমলা নতুন ধরনের ফসল। এ জন্য সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখা দরকার।








