মোহাম্মদ গোলাম নবী |
বাংলাদেশের বয়স আরও এক বছর বাড়ল। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের চার দশক পূর্ণ হবে। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার কাজ এখনো অনেক বাকি। কিছু কাজ আছে মৌলিক। যেমন, স্বাধীনতাযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের নামের তালিকা তৈরি করা ও তাঁদের হত্যাকারীসহ অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। স্বাধীনতাযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস রচনার কাজটিও এখনো বাকি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ওপর ছয় হাজার ১৪৮ শব্দে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রয়েছে, যা পড়ার পর মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে জানার চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণ করার তেমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থাশীল ওয়েবসাইট সরকারিভাবে এখনো গড়ে ওঠেনি। কেন গড়ে ওঠেনি, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে নানা ধরনের মতামত রয়েছে। যেমন, সরকার ওয়েবসাইটে স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার ব্যাপারে আন্তরিক নয়, কিংবা দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের ক্ষমতায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন করেছেন ইত্যাদি। এই অবস্থায় ইন্টারনেটে সামাজিক ওয়েবসাইট ও ব্লগগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের ঘাটতিগুলো কখনো ধরিয়ে দিতে, কখনো ঘাটতি পূরণে এবং কখনো প্রেশার গ্রুপ হিসেবে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো বিশেষ করে, ফেসবুক অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘আরব বসন্তের’ মতো সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলার মতো শক্তিশালী না হলেও জনমত তৈরিতে সামাজিক ওয়েবসাইটগুলো দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর মূল কারণ, সামাজিক এসব সাইটে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ব্যক্তিদের পদচারণই বেশি।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশি তরুণদের সামাজিক ওয়েব ঠিকানা নেই এমনটা প্রায় অকল্পনীয়। বিশ্বের সেরা ও জনপ্রিয় সামাজিক ওয়েবসাইট হলো—ফেসবুক, টুইটার, লিংকড-ইন, মাইস্পেস, নিং, গুগল প্লাস, অরকুট, হাইফাইভ ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশে ফেসবুকই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ২২ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর। খুদে ব্লগ লেখার ওয়েবসাইট টুইটারের জনপ্রিয়তাও বাংলাদেশে বাড়ছে ধীরে ধীরে। খবর ছড়িয়ে দিতে ফেসবুক ও টুইটারের জুড়ি নেই।
ফেসবুক এখন লাল-সবুজে ভরা। বাংলাদেশে ফেসবুক খুললেই এখন দেখা যাবে অসংখ্য বাংলাদেশি ব্যবহারকারী তাঁদের প্রোফাইল ছবি হিসেবে লাল-সবুজ পতাকা রেখেছেন। অনেকে আবার মাথায় লাল-সবুজ কাপড় বেঁধে বা লাল-সবুজ পোশাক পরে ছবি তুলে তা প্রকাশ করেছেন। এমনিতেই এখন বিভিন্ন বিষয়ে মতপ্রকাশ ও জনমত গড়ে তুলতে সামাজিক ওয়েবসাইটগুলোকে বাংলাদেশেও খুব ভালোভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করার মতো ইস্যুগুলোর পাশাপাশি সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়েও সামাজিক ওয়েবসাইটগুলোর ব্যবহারকারীরা সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা বা নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার কাজটি করতে ফেসবুকের মতো সাইটগুলো বেশ কার্যকর। এর পাশাপাশি বাংলা ব্লগসাইটগুলো তো বেশ কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেই চলেছে।
ইউটিউব কাজে লাগিয়ে ভিডিওর মাধ্যমেও এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন চালানো হচ্ছে। পাকিস্তান আমলের অর্থনৈতিক শোষণ, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক ভিডিওচিত্র ইউটিউবে (www.youtube.com) পাওয়া যায়।
ফেসবুকে (www.facebook.com) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শতাধিক পেজ রয়েছে। হাজার হাজার ব্যবহারকারী সেই পেজগুলোতে লাইক দিচ্ছেন বা তাঁদের পছন্দের কথা জানাচ্ছেন। আবার অনেক গ্রুপ রয়েছে, যেগুলোর সদস্যসংখ্যা ১০০ থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত। অনেক খুঁজে যা পেলাম, তাতে দেখা যাচ্ছে, ফেসবুকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় পেজ হলো ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনো’। এই পাতাটি ১৬ হাজার ৩১ জন পছন্দ করেছেন এবং প্রায় চার হাজার জন পাতাটি নিয়ে কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে পেজ বা গ্রুপগুলো সক্রিয় রয়েছে, সেগুলো প্রায় সবই উম্মুক্ত। যে কেউ চাইলেই সেখানে মন্তব্য লিখতে পারেন।
স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে গণমাধ্যম, যেমন—সংবাদপত্র, রেডিও বা টেলিভিশনে যা কিছু বলা হয়, তার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এই মাধ্যমগুলো ইন্টার অ্যাক্টিভ না হওয়ায় পাঠক তাঁদের মনের ভাব ও নিজেদের চিন্তাগুলো বিনিময় করতে পারেন না। ফেসবুকসহ ওয়েবভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো এই সীমাবদ্ধতা দূর করেছে। এখানে মতপ্রকাশের অবাধ সুযোগ রয়েছে। ব্যবহারকারীরা সেই সুযোগ পুরোমাত্রায় নিচ্ছেন। ফলে যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে একটি সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীনতার ইতিহাস একসময় যদি আমরা পাই, তার জন্য এই সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোকে ধন্যবাদ দিতে হবে।
১৬ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে ফেসবুক ও ব্লগসাইটগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শহীদদের তালিকা তৈরির আলোচনা জমে উঠেছে। বিজয়ের মাসের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে হাজার হাজার ব্যবহারকারী তাঁদের ‘প্রোফাইল পিকচার’-জাতীয় পতাকায় পরিবর্তন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছুই হচ্ছে না বলে যাঁরা হতাশা প্রকাশ করেন, তাঁদের হতাশ না হয়ে সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোতে সক্রিয় হতে অনুরোধ করব। ৪০ বছর একটি জাতির জন্য তেমন বেশি সময় নয়। ৫০ বছর পূর্তির আগেই আমরা সবাই মিলে নিশ্চয়ই ভালো কিছু করতে পারব। আসুন, অন্যের অপেক্ষায় না থেকে সহজ বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস তুলে আনি সামাজিক নেটওয়ার্কভিত্তিক কর্মকাণ্ডে।
This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it








