ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পণ্যের বড় বাজার হতে পারে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা। এ জন্য রপ্তানিমুখী পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ প্রয়োজন। কেননা, এখন বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।
আবার বাংলাদেশের বেশির ভাগ পণ্যই এখন রপ্তানি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে। এটাও রপ্তানিকে নির্দিষ্ট অঞ্চলনির্ভর করে রেখেছে।
‘বাংলাদেশের রপ্তানি প্রসার: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে গতকাল রোববার বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর পরিবাগে নিজস্ব কার্যালয়ে এই সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। সভাপতিত্ব করেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক ইমরুল কায়েস।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি জানান, বাণিজ্য প্রসার ও শ্রমশক্তি রপ্তানি সহজ করতে বিভিন্ন দেশে ১৯টি মিশন ও কনস্যুলেট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যত দ্রুত সম্ভব সরকার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।
দীপু মনি আরও বলেন, ‘জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটা ম্যাপিং করা দরকার। ১০ বছর পর কোথায় জনশক্তি রপ্তানি করা যাবে, সে বিষয়ে এখনই চিন্তা করতে হবে। আমাদের সে অনুযায়ী প্রস্তুত থাকতে হবে।’
রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপ কিংবা আমেরিকা নয়, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক (সাব-রিজিওনাল) সম্পর্ক জোরদার করতে সরকারও কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য আঞ্চলিক সংযোগের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
দীপু মনি জানান, রপ্তানি বাড়াতে বৈচিত্র্য ও বিশেষায়ন—দুটিই প্রয়োজন। দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে নীতি করা হলে তা ভালো ফল আনবে না।
নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে দীপু মনি বলেন, ‘অনেক সময় আমাদের কাজে ধারাবাহিকতা থাকে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা বদলি হয়ে যান। তাঁর সবকিছু গুছিয়ে নিতে সময় লাগে। তা ছাড়া সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইনস্টিটিউশনাল মেমোরিও পরিবর্তন হয়ে যায়। তাই নীতির ক্ষেত্রে সব সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয় না।’
আলোচনা: সেমিনারে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। একটি প্রবন্ধে বিআইআইএসএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাহফুজ কবির বলেন, ‘আমদানি করার জন্যই রপ্তানি করি—এমন একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে আছে।’
আরেক প্রবন্ধে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ জানান, স্পর্শকাতর পণ্যের দীর্ঘ তালিকার কারণে সাফটা অর্থবহ হচ্ছে না—বাংলাদেশেরই এমন পণ্যের সংখ্যা এক হাজার ২০০। তবে সম্প্রতি ভারত তার স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা কমিয়েছে। এটা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে, বিশেষত ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রাণের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান খান চৌধুরী জানান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বড় বাজার হতে পারে। কারণ, ভারতের রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা। আর মধ্যপ্রাচ্যের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশই অভিবাসী বাংলাদেশি।
আহসান খান অভ্যন্তরীণ চাহিদাসম্পন্ন দেশ, ব্যবসার উদ্যোগ, উৎপাদন ভিত্তি, আশাব্যঞ্জক কারিগরি সহায়তা, জিএসপি ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধাকে সফল রপ্তানির শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
আরেক প্রবন্ধে বেপজার মহাব্যবস্থাপক (বিনিয়োগ প্রসার) এ জেড এম আজিজুর রহমান জানান, বর্তমানে বিশ্বের ২১৭টি দেশে ১৭৬ ধরনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। যদিও বেশি রপ্তানি হয় তৈরি পোশাক।
দেশের রপ্তানি পণ্য ও দেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়—এই সমালোচনা সঠিক নয় মন্তব্য করে আজিজুর রহমান জানান, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে এ দেশের ২৫ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে হয়েছে ১৭৬ ধরনের। তা ছাড়া ’৭২-৭৩ অর্থবছরে যেখানে ৬৮টি দেশে পণ্য রপ্তানি হতো, সেখানে ২০০৯-১০ অর্থবছরে হয়েছে ২১৭টি দেশে।
সেমিনারে সাবেক বাণিজ্যসচিব সোহেল আহমেদ চৌধুরী জানান, বাণিজ্য প্রসারে দেশে এমন একটা রপ্তানি কৌশল থাকা উচিত, যা প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যাবে। যেমন: ইউরোপে সাম্প্রতিক যে মন্দা দেখা দিয়েছে, এমন অবস্থায় প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করা যেতে পারে।








