কমল হোসেন, মৌলভীবাজার
তাঁতে কাপড় বুনে আয় করছেন তাঁরা
দারিদ্র্যের সঙ্গে জন্মগত পরিচয়। কি বাবার বাড়িতে, কি স্বামীর ঘরে—সবখানেই দারিদ্র্যের নির্মমতা ও ছোবল। কারও হয়তো শুধু মাথা গোঁজার ভিটেটুকু আছে। কারও তা-ও নেই। অভাব-অনটনের টানাপোড়েনে জীবন আর চলে না। কিন্তু সেই জীবন থেকে বের হওয়ার রাস্তাও কারও জানা নেই। বাবা বা স্বামী—দিনমজুরি করে ও রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তাতে তিন বেলা হাঁড়ি চড়ানো যায় না। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য ছটফট করেন ভানুবিলের বাঙালি নারীরা। এ অঞ্চলটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের একটি পাহাড়ি এলাকা। টিলায় টিলায় বাড়িঘর। সরগরম হাটবাজার থেকে খুব দূরবর্তী গ্রাম না হলেও অনুন্নত রাস্তার কারণে অনেকটা দুর্গম।
গ্রামটি বেশ বড়। মণিপুরি অধ্যুষিত। আর মণিপুরি সমাজের ঘরে ঘরে রয়েছে তাঁত, যা ‘মণিপুরি তাঁত’ নামে জানে সবাই। ঐতিহ্যগতভাবে মণিপুরি নারীদের সবাই তাঁতে কাপড় বুনতে পারেন। কেউ কম বোনেন, কেউ বেশি, এই যা ব্যবধান। ভানুবিলের বাঙালি নারীরা দূর থেকে, পাশে থেকে তাঁতের সেই সূক্ষ্ম কাজ দেখেন আর বিস্মিত হন। অনেকের ধারণা, এই কাজ শুধু মণিপুরি নারীদের জন্য। তাই দেখে দেখেই যুগ যুগ কেটে গেছে প্রতিবেশী বাঙালি নারীদের। কখনোই তাঁদের মাথায় আসেনি এ কাজটি তাঁরাও শিখতে পারেন। তাঁরাও কাপড় বুনতে পারেন। এখান থেকে দুই পয়সা রোজগার করতে পারেন।
কিন্তু সময় হয়তো একই রকম যায় না। ভানুবিলের বাঙালি নারীরাও একদিন চোখ মেললেন। যেন বাড়ির কাছে আরশিনগর খুঁজে পাওয়া। তাঁরা হাত বাড়ালেন মণিপুরি তাঁতের দিকে। ভানুবিলের সুন্দরী বেগম তাঁদেরই একজন। বিয়ে হয়েছিল একই ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী গ্রাম আদখানিতে। এক মেয়ের জন্মের পরই স্বামী মারা গেলেন। চোখে অন্ধকার দেখলেন তিনি। মেয়েকে নিয়ে বাবা-ভাইয়ের সংসারে আবার ফেরা। মন খারাপ হয়ে থাকে। ভাইদের সংসারই চলে না, দিন চলে না। কী করবেন! সুন্দরী বেগম বললেন, ‘সব সময় মন চাইত নিজে একটা কিছু করি। আত্মনির্ভরশীল হই। অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে, অন্যের কাছে হাত পাততে মন মানত না।’ তিনি জানান, এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় বাড়ির কাছের মাঝেরগাঁওয়ে মণিপুরি তাঁত শেখা শুরু করলেন। সেটা প্রায় ১০-১২ বছর আগের কথা। মণিপুরি বাড়িতে তাদের তাঁতে কাজ করলেন। একটা আয়ের পথ হলো। এভাবে চলল প্রায় তিন-চার বছর। কাজ করে যা পান, তা দিয়ে তাঁর ও মেয়ের খরচ মোটামুটি চলে যায়। একপর্যায়ে মাথায় আসে নিজেই তাঁত বসাবেন। কাপড় বোনার কাজ তো নিজেই জানেন। তাঁতটা নিজের হলে আয়টা বেশি হবে। এই চিন্তা থেকেই প্রায় আট বছর আগে বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ ব্যাংক ও হিড থেকে টাকা ঋণ নিয়ে ঘরে দুটি তাঁত বসিয়েছেন। এ তাঁতেই এখন তিনিসহ মোট চারজন কাজ করছেন। তাঁত বসাতে তাঁর খরচ হয়েছিল ১৪ হাজার টাকা।
তাঁদের দেখানো পথ ধরে আকলিমা বেগম, মনোয়ারা বেগম, শমি বিবি, এশারুন বেগম, লায়লা বেগম, আজিজুননাহার, নুরুননাহার—এ রকম অনেকেরই ঘরে এখন ঘটাং ঘটাং করে তাঁত বোনার শব্দ বাজে।
গ্রামবাসী জানান, বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি বাঙালি পরিবারে মণিপুরি তাঁত বসেছে। আর এর সব উদ্যোক্তাই হচ্ছেন নারী। ঘরের সব কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা তাঁতে শাড়ি বুনছেন। যাঁদের নিজেদের তাঁত নেই, তাঁরা প্রতিবেশীর তাঁতে কাজ করছেন। তাঁদের আর দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না। এ ধরনের নারীর সংখ্যাও ভানুবিলে (আদি বা মধ্য) প্রায় আড়াই শ। এর মধ্যে অনেক ছোট ছোট মেয়েও আছে। সরেজমিনে গেলে ভানুবিলের এই বাঙালি নারীরা ঘরে ঘরে তাঁত তৈরির নীরব উত্থানের কথা জানালেন। সমবেত প্রায় অর্ধশত নারী, তরুণী, কিশোরীর চোখ-মুখে ফুটে ওঠে আত্মনির্ভরশীলতার প্রশান্তি। তাঁরা জানান, এই তাঁতের কাজ করে তাঁরা হয়তো তেমন বেশি কিছু করতে পারেন না। কিন্তু কেউ এখন আর না খেয়ে থাকছেন না। নারীরাই হয়ে উঠছেন সংসারের চালিকাশক্তি।
ভানুবিলের এই নারীরা জানালেন, ছোট (সিঙ্গেল) একটি তাঁত স্থাপনে খরচ হয় ছয় থেকে সাত হাজার এবং বড় (ডাবল) তাঁতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। একটি শাড়ি বুনতে দুজন শ্রমিক ও খরচ লাগে ২২০ টাকা। শাড়ির নকশা, মান ইত্যাদি অনুযায়ী এ খরচের তারতম্য আছে। একজন শ্রমিক একটি শাড়ি বুনে মজুরি কাজের ধরন অনুযায়ী ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পান। একটি শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। একটা তাঁত থেকে সপ্তাহে অন্তত দুটো শাড়ি তৈরি করা যায়। কাপড় নিয়ে তাঁদের হাটে যেতে হয় না। ব্যবসায়ীরা বাড়িতে এসেই কাপড় কিনে নিয়ে যান। এই তাঁত নারীরা জানিয়েছেন, পুঁজির কারণে তাঁরা তাঁত বাড়াতে পারেন না। অনেক সময় সুতা কিনতে পারেন না। তাঁত বন্ধ থাকে। বাকিতে সুতা আনেন। এতে দাম বেশি পড়ে, লাভ কমে যায়।
ভানুবিল গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষ্ণচন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম বলেন, ‘এই পরিবারগুলো খুব কষ্ট করেছে। পুরুষেরা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এখন পুরুষের আয়ের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নারীদের আয়। এই বাঙালি মেয়েরা তাঁতের কাজ শেখার পর নীরবে একটা পরিবর্তন এসেছে। সরকারি ঋণ না পাওয়া প্রসঙ্গে ময়রুন বেগম বলেন, ‘আমরা জানিনি সরকার কই থাকইন (কোথায় থাকেন)। জানলে না ঋণের নাগাল পাইতাম।’ সমাজকর্মী আহমদ সিরাজ বলেন, ‘তাঁদের পুঁজির সংকট রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে রকম মণিপুরি নারী তাঁতিদের ঋণ দিচ্ছে, এতে তাঁদের উপকার হচ্ছে।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘বাঙালি নারীরা মণিপুরি তাঁতে কাজ করে তাঁদের উন্নয়ন করছেন। বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে তাঁদের ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে কথা হয়েছে। এঁদের ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করলে এঁরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারবেন।’








