লেখক: ড. আহমদ আল-কবির |
বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশকে সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যে উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছানো একটি দুরূহ কাজ। অর্থনীতির তত্ত্বের নিরিখে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ও প্রবৃদ্ধি মেলানো কঠিন। চলমান বিশ্বমন্দার বিরূপ প্রভাবে উন্নয়নশীল তো বটেই, ইউরোপের গ্রিস ও ইতালির মতো শক্তিশালী অর্থনীতিও মুখ থুবড়ে পড়েছে। সাধারণভাবে আমাদের অর্থনৈতিক অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সূচকগুলো যথেষ্ট বেগবান ও বলিষ্ঠ। কৃষি, শিক্ষা, মা ও শিশুমৃত্যু, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে যুগান্তকারী উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্প ও কৃষিজ উত্পাদন, মাথাপিছু বিদ্যুত্ ও জ্বালানি ব্যবহারের হার, শিক্ষার— বিশেষত নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি সূচকে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০তম বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটি উন্নয়নের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছে।’
আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নতুন গন্তব্যে পৌঁছেছে। গত তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশেরও অধিক হারে বেড়েছে এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও উপর্যুপরি বাম্পার ফলনের কল্যাণে ২০১১-১২ সালে তা ৬.৭ শতাংশ অতিক্রম করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ হার গড়ে ৩.২ শতাংশ এবং উল্লেখ্য যে ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত গড়ে ৪.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদনের প্রবৃদ্ধির হার পাকিস্তান, নেপালসহ এ অঞ্চলের অপরাপর দেশ থেকে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৪৮৭ ডলার থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ৮১৮ ডলারে পৌঁছেছে যা বাংলাদেশকে অতি সত্বর একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি বড় অর্জন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সমপ্রতি বাংলাদেশের এ সাফল্যে অকপটে স্বীকার করেছেন। ২০১৫ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে ১৬টি দেশ সাফল্য দেখাতে পেরেছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, নারী উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও কৃষি উন্নয়ন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন তার সামপ্রতিক বাংলাদেশ সফরে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে স্পষ্ট করেই বলেছেন। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে উত্তরোত্তর সাফল্য অনেক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের কাছে আদর্শ হিসেবে কাজ করছে। জাতিসংঘের ৬৬টি শান্তি মিশনের মধ্যে ৪৫টি মিশনেই বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করেছে এবং দুটি মহিলা শান্তিরক্ষী দল পাঠাতে সক্ষম হয়। বিশ্বফোরামে বাংলাদেশের সাফল্যের মধ্যে ২০১০ সালের MDG Award-4, ২০১১ সালে South South News Award এবং ২০১০ সালে বাংলাদেশের দুটি NGO কর্তৃক Energy Innovation Award লাভ করা অন্যতম। এছাড়াও বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, জঙ্গিবাদ, সহিংসতাসহ সব আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
২০০৭-০৯ সালব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেও ২০১১ সালে আবারও একটি বড় ধাক্কা ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে হচ্ছে। মন্দা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো বিপুল বাজেট ঘাটতি, উচ্চ সরকারি ঋণ (public debt), মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের হার বৃদ্ধিসহ কয়েকটি দেশের সার্বভৌম ঋণ (sovereign debt) সমস্যা প্রবৃদ্ধির গতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি উন্নত দেশের চলতি হিসাবে বিশাল আকারের ঘাটতি এবং জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশ ও কয়েকটি বিকাশমান অর্থনীতির চলতি হিসাবে বিশাল আকারে উদ্বৃত্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। এ ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনার ব্যর্থতা বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অনেকটা নাজুক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পরিম লে নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাবও বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনার সংস্কার কার্যক্রমকে বিলম্বিত করছে।
বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রভাব ফেলেছে। এ প্রসঙ্গে স্বীকার করতেই হয় যে, সরকারের বলিষ্ঠ মুদ্রানীতি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেয়নি। তার সঙ্গে মার্কিন মুদ্রা ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে অধিকতর নাজুক করে তুলেছে। এর কারণ হিসেবে ব্যাপকহারে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগ এবং বিদেশি বিনিয়োগের অভাবকে দায়ী করেন। গত দুই অর্থবছরে মূলধনি বিনিয়োগের পরিমাণ আগের যে কোনো সময়ের ৫ বছরের বিনিয়োগের চেয়ে অধিক। বিদ্যুত্ ও জাহাজ নির্মানখাতসহ নতুন খাতে বিনিয়োগের বিরাট দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে। যা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলো অর্থনীতির জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে বলে আমি মনে করি না। ঘাটতি অর্থায়ন (deficit fianncing) এখনো বাজেটে উল্লিখিত অঙ্কের মধ্যেই রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে বিনিয়োগে গেছে যেখানে ক্রেডিট ডিপোজিট রেট ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় তত্ত্বাবধানের ফলেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর বিরূপ প্রভাব না পড়লেও ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক থেকে রফতানি ও আমদানি খাতে কিছুটা প্রভাব পড়ে যা ২০০৯-১০ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। মন্দা-পরবর্তী বিশ্ববাণিজ্যের গতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেরও বৈদেশিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় এবং ২০১০-১১ অর্থবছরের রফতানি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৩ বিলিয়ন ও ৩২ বিলিয়ন ডলার (যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ১০.৫ বিলিয়ন ও ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার)। ২০১১ সালের শেষ ছয় মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় আবারও বাংলাদেশে চাপ অনুভূত হচ্ছে এবং এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও সরকারি ঋণের বৃদ্ধি ঘটছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বিশ্বমন্দার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে যথাযথ আগাম ধারণা অর্জন এবং সে প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক উদ্যোগ ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মতো নানাবিধ সহায়তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে মন্দার বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। মন্দার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আবাসন শিল্পে ধস নামা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি রফতানি বৃদ্ধির গতি কিছুটা হ্রাস পায়। তবে এ সময় রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকে এবং ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয় যথাক্রমে ২২.৪২ শতাংশ ও ১৩.৪০ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জনশক্তি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেলেও জানুয়ারি, ২০১১ থেকে তা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং তা ২০১০-১১ অর্থবছরে ১১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে (২০০৫-০৬ বছরে এর পরিমাণ ছিল ৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার)। কর্মসংস্থান বাড়ানো ও বেকারত্ব কমাতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৬তম, যা তার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত (১১১তম), আফগানিস্তান (১৮০তম), পাকিস্তান (১৫২তম) এবং নেপাল (১৯০তম) থেকে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের পঞ্চম জনশক্তি রফতানিকারক দেশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক ও রাজস্ব খাতে গৃহীত ব্যবস্থার পাশাপাশি মুদ্রা খাতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে ধানের ভালো উত্পাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় আগামী মাসগুলোতে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধির গতি হ্রাস ও বিদ্যুত্সহ অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১০-১১ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত হ্রাস পেয়েছে। এ সময়ে বিনিময় হারের অবচিতি ঘটেছে। তা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহনশীল পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০০৬ সালে বৈদেকি মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ৯.৫ বিলিয়ন ডলার। জানুয়ারি ২০১১ থেকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছে। এছাড়া বিদ্যুত্ ও জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে সরকার যে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেছে তার সফল বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করবে যা দেশকে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
এ কথা বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কখনও ঋণাত্নক প্রবৃদ্ধি এ দেশে দেখা যায়নি। স্বাধীনতার আগে ও পরে এ দেশে মাত্র কয়েক বছর অর্থনীতির অবস্থা খারাপ ছিল এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অর্থনীতি নাজুক থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। স্বাধীনতার পর পর এদেশে মাত্র কয়েক’শ কোটি টাকার বাজেট ছিল। এখন তা লক্ষ কোটি অতিক্রম করেছে। এটা যে কোনো মাপকাঠিতে খুব বড় একটি অর্জন এবং এটা নিয়ে বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে আমরা গর্ব করতে পারি।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বিশ্বের যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঈর্ষার বিষয়। মোট জাতীয় উত্পাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ২০১১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ২৪তম ছিল (২০১০ সালে বাংলাদেশের এ অবস্থান ছিল ৫৫তম)। এর অর্থ হলো বিশ্বে এখন ১৯১টি স্বাধীন দেশ রয়েছে, যাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। তারপরও কি আমরা বলব বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র?
আমদানি ও রফতানি খাতে ২০১০-১১ অর্থবছরে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি অনেক বিশ্লেষককে আশ্চর্যান্বিত করেছে। এ দুই ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার শীর্ষ তিনের মধ্যে। পরিসংখ্যান দেখলে তা সহজেই বোঝা যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা প্রথম। রফতানির ক্ষেত্রে আমরা নতুন বাজারে প্রবেশ করছি। আমি মনে করি, রফতানিতে খুব তাড়াতাড়ি আমাদের গার্মেন্টস খাতের সঙ্গে রেমিট্যান্স খাত ও ওষুধ খাত প্রতিযোগিতা করবে। এ ছাড়া মানবসম্পদের উন্নয়ন করতে পারলে সে খাতটিরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে দক্ষ মানবসম্পদ রফতানির বড় সুযোগ রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাজার ধরতে পারলে রেমিট্যান্স কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।
খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানি মূল্য বিশ্বের সর্বত্রই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এটি হ্রাস পাবে এমন সম্ভাবনা কম। সম্মানিত বুদ্ধিজীবীদের আলোচনা শুনলে মনে হয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার জন্যই দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের অবগতির জন্য বলছি যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় একই রকম। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের হার কমছে এবং এ বছর তা ৩১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ এখন দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বাজার বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা তাদের নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী পুঁজিবাজারের ২০১১ সালের নিম্নমুখী প্রবণতা বিশ্লেষণ করলেও বর্তমানে সঠিক অবস্থা অনেকটা পরিষ্কার। আমি মনে করি পুঁজিবাজারে উত্থান ও পতন একটি স্বাভাবিক ব্যাপার এবং বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সার্বিক সরবরাহ বিবেচনায় নিয়ে ২০১০ সালে শেষের দিকে সূচকে ব্যাপক উত্থান ছিল অস্বাভাবিক। এ সময়ে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে বাজার থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নেয়। সমপ্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির ১৪৯১ জন পরিচালকের শতকরা দুই ভাগের কম শেয়ার তাদের নিজ কোম্পানিতে আছে। এ ছাড়াও ৩৮টি কোম্পানির স্পনসর ও পরিচালকদের শতকরা ৩০ ভাগের কম শেয়ার তাদের মালিকানায় আছে। এসব কোম্পানি ও পরিচালকরাই তাদের শেয়ার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করেছিলেন এবং তারা (ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী) তাদের মূলধন হারিয়েছেন। সরকার এ ধরনের অব্যবস্থা রোধে ডিমিউচুয়েলাইজেশন করার উদ্যোগসহ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট গ্রহণ করে এসইসিকে পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছেন। এসব ব্যবস্থার বাস্তবায়নকে সবাই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পুঁজিবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে কিছু প্রতিবন্ধকতার জন্য আমাদের অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় গতিশীল হতে পারছে না। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অবকাঠামোগত উন্নয়ন। পর্যাপ্ত গ্যাস, বিদ্যুত্, পানি প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাও জরুরি। আমাদের অর্থনীতির গতিশীলতার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আমলাতন্ত্রের দক্ষতার অভাবে প্রচুর অর্থব্যয় সত্ত্বেও দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আশানুরূপভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে না। এমনকি বৈদেশিক সহায়তা যথাযথ ব্যবহারের অপারগতায় বিভিন্ন প্রকল্পের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি ও বহু অর্থ অব্যবহূত থেকে ফেরত যাচ্ছে। এ সব প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও সব সময় আমাদের অর্থনীতিকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়, যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের খামখেয়ালিপনা, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও অস্থিরতা, বিশ্ববাজারে তেল ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি আমাদের অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেয়।
লেখক : চেয়ারম্যান রূপালী ব্যাংক








