দিনাজপুরে তুলা চাষ বাড়ছে
অন্যান্য ফসলের চেয়ে উৎপাদন খরচ ও বিপর্যয়ের ঝুঁকি কম। অন্যদিকে বাজারে আশানুরূপ দাম পাওয়ায় দিন দিন তুলা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন দিনাজপুরের চাষিরা।
তবে চাষিরা বলছেন, সরকারি ঋণ, উন্নতমানের বীজসহ বাড়তি সুবিধা পেলে তুলা উৎপাদন করে দেশের চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব হবে।
সূত্র জানায়, দেশের চাহিদার শতকরা মাত্র ১০ ভাগ উৎপাদিত হয়। বাকি ৯০ ভাগ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ভারত থেকে চাহিদার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ তুলা আমদানি করা হয়।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের তুলা গবেষণা বোর্ডের আওতাধীন একমাত্র প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর আঞ্চলিক তুলা গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বীজ বর্ধন কেন্দ্রের অধীনে সদর উপজেলাসহ ৭টি উপজেলায় চাষিরা তুলা চাষ করছেন।
তুলা বীজ বর্ধন কেন্দ্রের আওতাধীন ৩৪ হেক্টরসহ জেলার ৭ উপজেলায় ২০৫ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছে।
তিনি জানান, বেলে-দোআশ মাটি তুলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তুলা উৎপাদন করতে সময় লাগে ৬ মাস। প্রতি হেক্টর জমিতে এক দশমিক ৬ টন তুলা উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ একর প্রতি ২৫ মণ তুলা পাওয়া যায়।
এক একর জমিতে তুলা চাষ করতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর একর প্রতি উৎপাদিত তুলা বিক্রি হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। এরপর ১৯৮২ সালে দিনাজপুরের সদরপুরে ৫১ হেক্টর জমিতে নির্মিত হয় এ গবেষণা কেন্দ্রটি। তারপর থেকেই দিনাজপুরের তুলা চাষ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম তিনটি লক্ষ্য হলো- তুলার উন্নত জাত ও উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা; মৌলবীজ ও ভিত্তিবীজ উৎপাদন এবং তুলা চাষে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য চাষি, মাঠকর্মী, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
এছাড়া চুক্তিবদ্ধ ও তালিকাভুক্ত চাষিদের মাধ্যমে মানসম্পন্ন তুলাজীব উৎপাদন, চাষিদের উন্নতমানের তুলাবীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ঋণ ও অন্যান্য উপকরণ প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদান, উন্নত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, চাষিদের আগ্রহ সৃষ্টি ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য আলোচনা-সমাবেশ, তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত জমি জরিপ, আগ্রহী চাষিদের তালিকাভুক্তকরণ, তুলাচাষে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন ও গবেষণা বিষয়ক যে কোনো তথ্য প্রদান এই কেন্দ্রের অন্যতম কার্যক্রম ও সেবা।
প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে এই কেন্দ্র থেকে তুলাচাষিরা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের মৌল ও ভিত্তি বীজ।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সার্বিক সহযোগিতায় গতবছরের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণ পরিমাণ জমিতে তুলা চাষ করছেন চাষিরা। তবে আগামীতে এ পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
তুলার বিভিন্ন জাতের মধ্যে সিবি-১২, সিবি-৯ ও সিবি-১০ ভ্যারাইটির স্বল্প সময়ে উৎপাদন বেশি হয়। উৎপাদিত তুলা উন্নয়ন বোর্ড সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী দামে কিনে নেওয়ায় কৃষকরা অন্য ফসলের চেয়ে তুলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
দিনাজপুর তুলা গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বীজ বর্ধন কেন্দ্রের কটন এগ্রোনমিস্ট এএইচএম কায়কোবাদ বাংলানিউজকে জানান, সমভূমিতে তুলা চাষ এ অঞ্চলে দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মূলত এই কেন্দ্রে গবেষণার কাজ হয়।
অনেক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও গবেষণার কাজ চলে। তবে যেখানে চার-পাঁচজন বিজ্ঞানী থাকার কথা, সেখানে একজন দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। জনবল সঙ্কটের কারণে কেন্দ্রের কার্যক্রম অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, এবার সরকারিভাবে ৫০ হাজার কেজি বীজ তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এবার ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কেজি বীজ তুলা উৎপাদিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তুলা চাষি ওয়াজেদুর রহমান বাবলু বলেন, তুলা চাষে প্রাকৃতিক কোনো ঝুঁকি নেই। এছাড়া গরু-ছাগলও তুলা ক্ষেত নষ্ট করে না। পাশাপাশি উৎপাদিত তুলা বিক্রির জন্য হাটবাজারে দৌঁড়ঝাপ করতে হয় না। উৎপাদিত তুলা সরাসরি তুলা উন্নয়ন বোর্ডই ন্যায্যমূল্যে কিনে নেয়।
এজন্য অনেক কৃষকই এখন তুলা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সরকার ঋণ সুবিধাসহ সহজ শর্তে উপকরণ দিলে তুলা আবাদে আরও উৎসাহীত হবেন কৃষকরা।
সমভূমিতে তুলা উৎপাদন বাড়াতে সহজ শর্তে সরকার গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং চাষিদের ব্যাংক ঋণসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করলে উন্নত মানের তুলা উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতিতে তারা অবদান রাখতে পারবেন বলে তুলা চাষিরা আশা করছেন।








