কোরআন শরিফকে তওরাতের মুসাদ্দিক বা সত্যায়নকারী বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। এর কারণ এই যে, তওরাতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ও কোরআন শরিফ অবতরণের যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, কোরআনের মাধ্যমেও সেগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং যারা তওরাতকে স্বীকার করে, তারা কিছুতেই কোরআন শরিফ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে অস্বীকার করতে পারে না। তা করতে গেলে প্রকারান্তরে তওরাতকেই অস্বীকার করা হয়।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, তারা যখন সত্যকে সত্য বলেই জানতো, তখন তাদেরকে ঈমানদার বলাই উচিত, কাফের বলা হলো কেন?
এর উত্তর হলো, শুধু জানাকেই ঈমান বলা যায় না। শয়তানের সত্যজ্ঞান সবার চাইতে বেশি। তাই বলে সে ঈমানদার হয়ে যাবে নাকি? জানা সত্ত্বেও অস্বীকার করার কারণে কুফরের তীব্রতাই বৃদ্ধি পেয়েছে। সুরা বাকারাতেই তাদের শত্রুতাকে কুফরের কারণ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
এখানে এক ক্রোধ কুফরের কারণে এবং অপর ক্রোধ হিংসার কারণে। এজন্যই ক্রোধের ওপর ক্রোধ বলা হয়েছে। শাস্তির সাথে অপমানজনক শব্দ যোগ করে বলা হয়েছে, এ শাস্তি কাফেরদের জন্যই নির্দিষ্ট। কেননা পাপী ঈমানদারকে যে শাস্তি দেওয়া হবে, তা হবে তাকে পাপমুক্ত করার উদ্দেশ্যে, অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়। পরবর্তী আয়াতে তাদের যে উক্তি উদ্ধৃত হয়েছে, তা থেকে কুফর প্রমাণিত হয় এবং হিংসাও বোঝা যায়।
‘আমরা শুধু তওরাতের প্রতিই ঈমান আনব, অন্যান্য গ্রন্থের প্রতি ঈমান আনব না’Ñইহুদিদের এ উক্তি সুস্পষ্ট কুফর। সেই সাথে তাদের উক্তি, ‘যা (তওরাত) আমাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে’Ñএ থেকে প্রতিহিংসা বোঝা যায়। এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে এইÑঅন্যান্য গ্রন্থ যেহেতু আমাদের প্রতি নাজিল করা হয়নি, কাজেই আমরা সেগুলোর প্রতি ঈমান আনব না। আল্লাহ তায়ালা তিন পন্থায় তাদের এ উক্তি খ-ন করেছেন।
প্রথমত অন্যান্য গ্রন্থের সত্যতা ও বাস্তবতা যখন অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত, তখন সেগুলো অস্বীকার করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। অবশ্য দলিলের মধ্যে কোনো আপত্তি থাকলে তারা তা উপস্থিত করে দূও করে নিতে পারতো। অহেতুক অস্বীকারের কোনো মানে হয় না।
দ্বিতীয়ত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে একটি হচ্ছে কোরআন মজিদ, যা তওরাতেরও সত্যায়ন করে। সুতরাং কোরআন মজিদকে অস্বীকার করলে তওরাতের অস্বীকৃতিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত সকল খোদায়ি গ্রন্থেও মতেই পয়গাম্বরদের হত্যা করা কুফর। তোমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা কয়েকজন পয়গাম্বরকে হত্যা করেছে। অথচ তারা বিশেষভাবে তওরাতের শিক্ষাই প্রচার করতেন। তোমরা সেসব হত্যাকারীকেই নেতা ও পুরোহিত মনে করেছ। এভাবে কি তোমরা তওরাতের সাথেই কুফরি করনি? সুতরাং তওরাতের প্রতি তোমাদের ঈমান আনার দাবি অসার প্রমাণিত হয়ে যায়। মোটকথা, কোনো দিক দিয়েই তোমাদের কথা ও কাজ শুদ্ধ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পরবর্তী আয়াতে আরো কতিপয় যুক্তি দ্বারা ইহুদিদের দাবি খ-ন করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে তওরাত অবতরণের পূর্বে। তখন হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম) এর নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যেসব যুক্তি প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত ছিল, আয়াতে ‘বায়্যিনাত’ বলে সেগুলোকেই বোঝানো হয়েছে। যেমন, লাঠি, জ্যোতির্ময় হাত, সাগর দ্বি-খ-িত হওয়া ইত্যাদি।
ইহুদিদের দাবির খ-নে আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা একদিকে ঈমানের দাবি কর, অন্যদিকে প্রকাশ্য শিরকে লিপ্ত হও। ফলে শুধু মুসা (আ.) কেই নয়, আল্লাহকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে চলেছ। কোরআন অবতরণের সময় হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আমলে যেসব ইহুদি ছিল, তারা গোবৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করেনি সত্য; কিন্তু তারা নিজেদের পূর্ব পুরুষদের সমর্থক ছিল। অতএব তারাও মোটামুটিভাবে এ আয়াতের লক্ষ্য।
আয়াতে বর্ণিত কারণ ও ঘটনাসমূহের সারমর্ম এই যে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পর তারা একটি কুফরি বাক্য উচ্চারণ করে। পরে মুসা (আ.) এর শাসানোর ফলে যদিও তওবা করে নেয়, কিন্তু তওবারও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। উচ্চস্তরের তওবার অভাবে তাদের অন্তরে কুফরের কালিমা থেকেই যায়। পরে সেটাই বেড়ে গিয়ে গোবৎস পূজার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোনো কোনো টীকাকারের বর্ণনা মতে, গোবৎস পূজা থেকে তওবা করতে গিয়ে তাদের কিছু লোককে হত্যা বরণ করতে হয় এবং কিছু লোক ক্ষমা প্রাপ্ত হয়। এদের তওবাও সম্ভবত দুর্বল ছিল। এছাড়া যারা গোবৎস পূজায় জড়িত ছিল না, তারাও অন্তরে গোবৎস পূজারীদের প্রতি প্রয়োজনীয় ঘৃণা পোষণ করতে পারেনি। ফলে তাদের অন্তরে শিরকের প্রভাব কিছু না কিছু অবশিষ্ট ছিল। মোটকথা, তওবার দুর্বলতা ও শিরকের প্রতি প্রয়োজনীয় ঘৃণার অভাবÑএই দুয়ের প্রতিক্রিয়ায় তাদের অন্তরে ধর্মের প্রতি শৈথিল্য দানা বেঁধে উঠেছিল। এজন্যই অঙ্গীকার নেওয়ার জন্য তুর পর্বতকে তাদের মাথার উপর ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়।








