বাংলাদেশের শিশুচিকিৎসার পথিকৃৎ জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান তাঁর জীবনের জলছবি বইতে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘এ জীবন লইয়া কী করিব?’ তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি আলাপকালেও তিনি এর উল্লেখ করে বলেন, ‘এই প্রশ্নটি জীবনসায়াহ্নে এসেও আমাকে বড়ই বিচলিত করে। ভাবি, মানুষের জীবনের প্রকৃত সাফল্য ও সার্থকতা কোথায় নিহিত। আমি এখনো এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফিরি।’
এম আর খান বলে চলেন, ‘প্রত্যেক মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থান ও ক্ষেত্র থেকে আর্থসামাজিক বিনির্মাণে অবদান রেখে চলেছে। একজন কৃষক উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করে যেমন করে ফসল ফলান, কিংবা একজন শ্রমিক দিনরাত কায়িক পরিশ্রম করে সচল রাখেন কারখানার চাকা;সেভাবে আমিও আমার অবস্থান থেকে মানুষের জন্য সাধ্যমতো কিছু করে যেতে চাই।’
এম আর খানের জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট সাতক্ষীরার রসুলপুরে। ১৯৫৩ সালে এমবিবিএস পাস করেন কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে। মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর চলে আসেন তাঁর নিজের ছোট্ট শহর সাতক্ষীরায়। মফস্বলের মানুষ তাঁকে পেয়ে রীতিমতো আয়োজন করে সংবর্ধনা দিয়ে ফেলল। তিনি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়লেন নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে। স্থানীয় লোকজন এই সুশিক্ষিত তরুণটিকে তাদের প্রতিনিধি বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগল। প্রথমে রাজি না হলেও কাছের মানুষের চাপে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন। ভাবলেন, ভোটে জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান হলে উন্নয়নমূলক ও সেবাধর্মী কাজের প্রসার ঘটানো যাবে। কিন্তু ব্যবসায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাঁর বন্ধু সিএসপি অফিসারের চক্রান্তে তিনি নির্বাচনে হেরে যান। তারপর অভিমান করে সাতক্ষীরা ছেড়ে খুলনায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এই গল্প শুনিয়ে চিরতরুণ এম আর খান একটু হেসে বলেন, ‘তার পরও হতাশ হইনি। নিজেকে নতুন করে গোছালাম। ছুটলাম যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।ভাবি, ভাগ্যিস সেদিন নির্বাচনে পাস করতে পারিনি! কে জানে, তাহলে কী হতো!’
এরপর এম আর খানকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধুই এগিয়ে যাওয়ার পালা—এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিটিএমঅ্যান্ডএইচ, এমআরসিপি, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসিএইচ, ঢাকার পিজি থেকে এফসিপিএস,ইংল্যান্ড থেকে এফআরসিপি।
এম আর খানকে জিজ্ঞেস করি, জীবনের শুরুতে একটি ব্যর্থতা সামলে নিজেকে কীভাবে নতুন করে সাজালেন?কীভাবে পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের অভিধান থেকে‘অসফল’ শব্দটি হারিয়ে গেল? এবার তিনি স্মিত হাসেন।বলেন, ‘ছোটখাটো ব্যর্থতা যে নেই তা তো নয়, আছে কিছু অতৃপ্তিও। তার পরও যা করতে চাই, তা হয়ে যাচ্ছে।কারণ, আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার, আমি মানুষের জন্য কিছু একটা করতে আন্তরিক ছিলাম। তারপর সে লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাই।’
যুক্তরাজ্য থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে এম আর খান যখন ফিরলেন, তখন বড় ডিগ্রিধারী এই চিকিৎসককে নিজের শহরে রাখার জন্য লাহোর-করাচির অনেকেই ধরলেন। এর মধ্যে শফি সাহেব নামের এক ভদ্রলোক করাচির স্টেডিয়াম এলাকায় নিজের ১০ কাঠা জমিও তাঁর নামে লিখে দিতে চাইলেন। ব্রিটেনের বোল্টন হাসপাতাল, ইডেন হল হাসপাতাল ও কেন্ট হাসপাতালের চাকরি, লাহোর-করাচির অভিজাত জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি ছুটে এলেন বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দরিদ্র মানুষের সেবার জন্য। যোগ দিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। প্রতিষ্ঠা করলেন শিশুরোগ বিভাগ। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। পরে পিজি হাসপাতালের পরিচালক হন।
সুযোগ পেলেই মানুষ তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবতার ভিত দিতে চায়। অধ্যাপক এম আর খানও সে পথে হাঁটলেন।পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠা করেছেন শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল, যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, রসুলপুর উচ্চবিদ্যালয়, উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল,নিবেদিতা নার্সিং হোমসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান ‘আধূনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে।
প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়াল-এ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার। আর যে পুরস্কারটি তাঁকে এই বয়সেও অনুপ্রাণিত করে, তা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। ৮৩ বছর বয়সী চিরতরুণ এই মানুষটি এখনো দেশ ও মানুষের জন্য অক্লান্ত কাজ করে চলেছেন। এখনো ছুটে যান এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে পড়াতে। ছুটে যান আইসিডিডিআরবি,বারডেম, বিএসএমএমইউতে।
জিজ্ঞেস করি, এত কাজ কীভাবে করেন? উত্তরে বলেন, ‘এমন একটি কর্মময় জীবনের স্বপ্নই তো দেখতাম, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই কাজ করে যেতে চাই। কাজ ছাড়া সাফল্য আসে না।’
জিজ্ঞেস করি, আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের রহস্য কী?আবারও প্রায় একই উত্তর, ‘কাজ, কাজ আর কাজ।’








