রাজিব হাসান : বিলেত থেকে বাংলাদেশে মালামাল পাঠানোর ক্ষেত্রে একমাত্র মাধ্যম হলো কার্গো। প্রিয়জনের কাছে পাঠানো উপহার কিংবা নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল পাঠানোর হার বর্তমানে যেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বছর কয়েক আগেও তেমনটি ছিল না। দ্রুত মুনাফার জন্য এখন অনেকেই ব্যবসা পরিবর্তন করে কার্গো ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
তবে, এই কার্গো সেক্টরকে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য যে মানুষটি তাঁর মেধার সমন্বয়ে এখনো অকান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন - তিনি হলে মনির আহমেদ।
গ্রাহকদের কাছে কার্গো সার্ভিসের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য মনির আহমেদের এই ব্যবসা অগ্রপথিকের কাজ করেছে। বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের কাছে এয়ার কার্গো ব্যবসায়ের ব্যাপক পরিচয় ঘটিয়েছেন তিনি। কার্গো সার্ভিসকে তিনি স্বল্প খরচে সুলভ করবার পাশাপাশি ভোক্তাসাধারণের কাছে পৌঁছবার ক্ষেত্রেতিনি এতে এক অন্যরকম গতি আনতে সম হয়েছেন। কমিউনিটির প্রতি যে মূল্যবোধ তিনি লালন করেছেন, তা সবসময়ই ধারণ করেছেন। এসব কারণেই জিএমজি বর্তমানে কার্গো ব্যবসায়ে অন্যতম শীর্ষ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।
কিছুটা পিছনে ফিরে দেখা যাক। সময়টা তখন ছিল ১৯৮৪ সাল। সিলেটের জিন্দাবাজারে খালাতো ভাই তালেবুন নূরের (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) সাথে যৌথ ব্যবস্থাপনায় ‘ওভারসীজ কার্গো ম্যানেজম্যান্ট’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। ছাত্র থাকাবস্থাতেই তিনি এই ব্যবসায় পুরোদমে চালিয়ে যান। প্রায় দীর্ঘ ১৬ বছর ব্যবসা করার পর ২০০০ সালে পাড়ি জমান বিলেতে। ব্যবসাকালীন সময়ে তিনি সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মদন মোহন কলেজ সিলেট থেকে বিএ পাশ করেন।
বিলেতে এসেই কার্গো সার্ভিসের উপর বেশ কয়েকটি কোর্সও করেন তিনি। গ্রাহক চাহিদার কথা বিবেচনা করেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন 'জেএমজি এয়ার কার্গো'। পূর্ব লন্ডনের ৮ ফোডহ্যাম স্ট্রিটে এর অফিস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ বিমানের অধিকাংশ কার্গোরই যোগান দিচ্ছে। ব্রিটেনে জেএমজি’র ১০০টিরও বেশি এজেন্ট রয়েছে। কোম্পানিটি এর এজেন্টদের প্রতিবছর ‘টপ সেলস এ্যাওয়ার্ড’ এবং কর্মীদেরকে বিশেষ প্রশিণ দিয়ে থাকে।
২০০৫-০৬ সালে যেখানে বছরে কার্গো সেক্টর হতে বিমানের আয় হতো দু‘শ হাজার পাউন্ড, তা এখন হচ্ছে প্রতি মাসে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের আয়ের উৎস বিমানের অনবরত লোকসানের মাত্রাটা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিচ্ছে। আর বিলেত থেকে পাঠানো কার্গোর সিংহভাগ হলো- জেএমজি কার্গোর।
ইইউ-সদস্য রাষ্ট্রসমূহ, আফ্রিকার অংশবিশেষ এবং এশিয়া ও কানাডায় জনসাধারণের দোরগোড়ায় এই কোম্পানি তাদের সেবা পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি ইতালি এবং ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে কার্গো সার্ভিস চালু করবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
বাংলা নিউজের সাথে একান্ত আলাপকালে - বাংলাদেশ বিমানের কার্গো সার্ভিসের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সংকটের কথাটি অকপটে তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, বিমানের সার্ভিস এখনো সর্বোত্তম। তবে, পর্যাপ্ত জায়গা না হওয়ার কারণে অনেক গ্রাহকদের কাছে মালামাল পৌছাতে দেরী হয়ে যায় প্রায়শই।
মূলত ২০০৭ সাল থেকেই কার্গো ব্যবসায় নতুন গতি যোগ হয়। মিডিয়ার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন কার্গো বিজনেস আইকন মনির আহমেদ বলেন, মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমেই জেএমজি কার্গো খুব দ্রুত প্রসার লাভ করে। আর এজন্য মিডিয়াগুলোর প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা কথা বললেন।
সফল এই তরুণ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তার সমাজকর্মী হিসেবেও রয়েছে বিপুল পরিচিতি। ১৯৭০ সালে সিলেট জেলাধীন বিশ্বনাথের মোহাম্মদপুর গ্রামে মনির আহমেদের জন্ম। তারা বাবা মৃত জমশেদ আলী এবং মা মাহমুদা খাতুন। তিনি রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়, বিশ্বনাথ থেকে এসএসসি, সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মদন মোহন কলেজ সিলেট থেকে বিএ পাশ করেন। তিনি ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেইট এসোসিয়েশন (বিআইএফএ) থেকে ‘এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট সিস্টেম প্রসেসিং এন্ড কার্গো’ বিষয়ে সনদ অর্জন করেছেন।
সেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং পরিশ্রমি চরিত্রের কারণে মনির আহমেদ বিশেষভাবে পরিচিত। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি সিলেট সিএনএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্য হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এছাড়াও বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারের বিজনেস এক্সিকিউটিভ মেম্বার এবং বিশ্বনাথ ইয়ুথ এসোসিয়শনের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি (সাংগঠনিক সম্পাদক) হিসেবে তার কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি প্রতিনিয়ত নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকেন। জনকল্যাণমূলক কাজে তার অনুদানের কারণেও তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত। বাংলাদেশে সংঘটিত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার সংগঠন অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশ্বনাথ এডুকেশন ট্রাস্টের ট্রাস্টি, দারুল কুরআন নাজিরবাজার চ্যারিটি অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান এবং বিবিআর ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের চেয়ারম্যান। আল-জামেয়া গ্রুপ অব ইনভেস্টমেন্ট ইউকে-এর ফিন্যান্স ডিরেক্টরও তিনি।
সদা হাস্যোজ্জ্বল অমায়িক মনির আহমেদ ২০১০-২০১১ সালে নিউহাম ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট থেকে ‘বিজনেস এন্ড কমিউনিটি এ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। ব্যাবসায়ি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখবার জন্যে ব্রিটিশ বাংলাদেশ ‘হুজ হু ২০১১’ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও ব্যবসায়িক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি ‘সেরা ব্রিটিশ বাংলাদেশী’ হবার গৌরব অর্জন করেছেন। ২০১১-১২ সালে মিডিয়াকে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদানের পুরস্কার হিসেবে দর্পন পত্রিকা তাদের ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মনির আহমেদকে বিশেষ পদক প্রদান করে।
শ্রোতাদের ভোটে বৃটেনের জনপ্রিয় কমিউনিটি রেডিও বেতার বাংলা’র বর্ষসেরা অ্যাওয়ার্ড-২০১২ অর্জন করেন এই গুনী ব্যবসায়ী।
মনির আহমেদ তার সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভবিষ্যতে কমিউনিটিকে আরো বেশি সহায়তা প্রদান করতে চান তিনি। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ব্রিটেনের গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নে তিনি কাজ করতে আগ্রহী।








