লেখক: মোজাহেদুল ইসলাম
বিশ্বব্যাপী ক্রমেই বাড়ছে আউটসোর্সিংয়েই বাজার। সেই সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ওডেস্কে’র কনট্রাক্টর অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’ তারই প্রমাণ দেয়। চলতি বছরের শুরুতে প্রফেশনালদের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক কেপিএমজি থেকেও একটি প্রতিবেদনে একটি বাংলাদেশের আউটসোর্সিংয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সব মিলিয়ে সারাবিশ্বে আউটসোর্সিং এবং বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে এই লেখাটি লিখেছেন মোজাহেদুল ইসলাম
আউটসোর্সিং শব্দটি আজ থেকে পাঁচ বছর আগে খুব বেশি পরিচিত ছিল না আমাদের দেশে। তবে সময়ের সাথে সাথে অবস্থা পাল্টে গেছে। এখন আউটসোর্সিং শব্দটির সাথে কমবেশি অনেকেই পরিচিত। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আউটসোর্সিং শব্দটিই কেবল নয়, আউটসোর্সিংয়ের যাবতীয় বিষয়ই এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী যেভাবে বাড়ছে আউটসোর্সিং কাজের পরিমাণ, তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের দেশেও বেড়ে চলেছে আউটসোসিংয়ে যুক্ত মানুষের সংখ্যা। আর কেবল সংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, সার্বিক বিচারেই এখন বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ আউটসোর্সিং দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বাড়ছে আউটসোর্সিংয়ের বাজার
বিশ্বব্যাপী ক্রমেই বেড়ে চলেছে আউটসোর্সিংয়ের বাজার। প্রযুক্তি বিশ্লেষক সংস্থা হিসেবে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গার্টনার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১০ সালের তুলনাতে ২০১১ সালের আইটি আউটসোর্সিং খাতের বাজার অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সালে যেখানে এই বাজারের পরিমাণ ছিলো প্রায় ২২৮ বিলিয়ন ডলার, ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৪৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্, এই এক বছরে বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিংয়ের বাজার বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। তাদের হিসেবে, এখনো পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ে এগিয়ে থাকা শীর্ষ দেশটির নাম ভারত। আর ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন। গার্টনারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ক্লাউড-নির্ভর আউটসোর্সিংয়ের কাজের প্রসার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আর আউটসোর্সিংয়ের শীর্ষ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলেই জানা যায় এ প্রতিবেদন থেকে। এদিকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসেবে শীর্ষ আইটি আউটসোর্সিং কোম্পানি হিসেবে রয়েছে আইবিএম। তারপরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে এইচপি, ফুজিত্সু’র মতো সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
এদিকে কেপিএমজি’র প্রতিবেদনেও আউটসোর্সিংয়ের প্রবণতাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আইটি আউটসোর্সিং এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংয়ের বাজার গত এক দশকে যেভাবে বাড়ছে, তাতে করে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই বাজার গিয়ে দাঁড়াবে বর্তমান বাজারের দ্বিগুণে। অর্থাত্, ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী সার্বিক আউটসোর্সিংয়ের বাজার পৌঁছে যাবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে। এই বিস্তৃত বাজারের আউটসোর্সিংয়ে মূলত এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোর উপরেই মূল নির্ভরতা তৈরি হবে বলে জানাচ্ছে কেপিএমজি। আর সেই নির্ভরতার স্থানে বাংলাদেশও রয়েছে বলেই মন্তব্য তাদের। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ফিলিপাইন বা পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর চাইতে বাংলাদেশের আউটসোর্সিংয়ে সার্বিক সাফল্য এদেশের আরও উজ্জ্বল সম্ভাবনার প্রমাণ দেয় বলেই মত দিয়েছে এই প্রতিবেদন।
আউটসোর্সিং ও বাংলাদেশ
আউটসোর্সিংয়ে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ অর্জন করেছে বিপুল অগ্রগতি। সীমিত গতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং আইটি বিষয়ে শিক্ষার প্রভূত প্রসার না থাকলেও আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে যে সাফল্য লাভ করেছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছে প্রযুক্তি বিশ্বের সকলেই। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশে আউটসোর্সিংয়ে ভালো করার সম্ভাবনা অনুধাবন করার সাথে সাথে বদলে গেছে দেশের প্রেক্ষাপট। দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নানান উদ্যোগে এখন সরকারও আউটসোর্সিং খাতকে গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করছে। এর মধ্যে দেশে ওয়াইম্যাক্স অপারেটরগুলোর আবির্ভাব উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগকে অনেকখানি সহজলভ্য করেছে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে। পাশাপাশি দেশব্যাপী আইটি শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণসমূহ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে সব ক্ষেত্রেই। ফলে আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত মানুষের সংখ্যা এবং কাজের পরিমাণও বাড়ছে। যা দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করছে। এর মধ্যে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের অনুমোদন সংশ্লিষ্টদের আরও বেশি প্রভাবিত করেছে ইতিবাচকভাবে। যার ফলে দেশে আইটি এবং আইটি এনাবল্ড সার্ভিসের ব্যবহারও বাড়ছে। আউটসোর্সিংয়ের শীর্ষ ৩০ দেশের যে তালিকাটি গার্টনার তৈরি করে ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে, আউটসোর্সিংয়ে অগ্রগতির স্বীকৃতিস্বরূপ সেই তালিকায় প্রথমবারের মতো স্থান করে নেয় বাংলাদেশ তারপর থেকে এই খাতে অর্জন আরও বেড়েছে সময়ের সাথে সাথে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওডেস্কের ‘কন্ট্রাক্টর অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’তেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
ওডেস্কে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংয়ের সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইটটির নাম ওডেস্ক। আর এই ওডেস্কও বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। যে কারণে গত এক বছরের মধ্যেই ওডেস্কের পক্ষ থেকে কয়েকবার বাংলাদেশে সফর করে গেছেন ওডেস্কের শীর্ষস্থানীয় সব কর্মকর্তা। এখানে তারা বিশ্বের আউটসোর্সিং পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, সাক্ষাত্ করেছেন আমাদের দেশের ফ্রিল্যান্সারদের সাথে। একইসাথে এখানকার ফ্রিল্যান্সারদের উত্সাহ এবং পরামর্শ প্রদান করেছেন। সর্বশেষ চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ওডেস্কের উদ্যোগে ‘কনট্রাক্টরস অ্যাপ্রিপ্রিয়েশন ডে’। এতে উপস্থিত ছিলেন ওডেস্কের অপারেশন্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট কুপার। আউটসোর্সিংয়ে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত পরিচিত এই ব্যক্তি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে অত্যন্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ওডেস্কের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের দ্বিতীয় চতুর্ভাগের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম চতুর্ভাগে ওডেস্কে কর্মঘণ্টা বেড়েছে প্রায় ৭.২ গুণ। বাংলাদেশ থেকে ওডেস্কের কর্মঘণ্টা বৃদ্ধির পরিমাণটি অত্যন্ত ইতিবাচক। যেমন, ২০১১ সালের প্রথম চতুর্ভাগে ওডেস্কের মোট কর্মঘণ্টা ছিলো ৩ লক্ষ কর্মঘণ্টার কিছু কম। গত বছরেরই দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ চতুর্ভাগে এর পরিমাণ ছিলো যথাক্রমে সাড়ে তিন লক্ষ ঘণ্টা, সাড়ে চার লক্ষ ঘণ্টা এবং প্রায় ৬ লক্ষ ঘণ্টা। সেখান থেকে চলতি বছরের প্রথম চতুর্ভাগে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লক্ষ ২০ হাজার ঘণ্টায়। অর্থাত্ গত বছর শেষ চতুর্ভাগ থেকে এ বছরের প্রথম চতুর্ভাগে ওডেস্কে বাংলাদেশের কর্মঘণ্টা বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। আর গড়ে প্রতি চতুর্ভাগেই বাংলাদেশ থেকে ওডেস্কে ১ লাখেরও বেশি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা যুক্ত হচ্ছে। এতে করে চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩০ লাখ ঘণ্টারও বেশি কাজ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে ওডেস্ক।
ওডেস্কের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী ওয়েব প্রোগ্রামিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি আউটসোর্সিংয়ের কাজ হলেও বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়ে থাকে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) নিয়ে। এ ছাড়া ডাটা এন্ট্রি, ওয়েব রিসার্চ, ওয়েব প্রোগ্রামিংসহ অন্যান্য প্রায় সব ধরনের কাজই হয়ে থাকে এখান থেকে।
সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বয়সে তরুণ। আর এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনার স্থান। কেননা, এই তরুণের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী। এটাই বাংলাদেশের আউটসোর্সিংয়ে সম্ভাবনাকে অনেক এগিয়ে রাখে। তবে সম্ভাবনার সফল অনুবাদে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সুবিধা প্রদান। পুরো দেশের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে এখনও আমাদের দেশে আইটিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আইটি শিক্ষার প্রসারও নেই সর্বত্র। আউটসোর্সিংয়ে আমাদের অগ্রগতিকে ধরে রাখতে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দেশব্যাপী আইটি অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে আইটি নিয়ে যে আগ্রহ রয়েছে, তা বিকশিত করতে প্রয়োজন তাদের জন্য নানান ধরনের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত কর্মসূচী। বেসরকারি নানান উদ্যোগের পাশাপাশি সরকার থেকেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর তাহলেই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আউটসোর্সিংয়ে আমাদের অবস্থান আরও সামনে এগিয়ে যাবে।








