নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে যে কজন শিক্ষাবিদ ও গবেষক কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে দুই বছর মেয়াদের জন্য 'রোকেয়া চেয়ার' মনোনয়ন দেওয়া হয়। ড. হাসনা বেগম এ দেশের দ্বিতীয় এবং দর্শন বিভাগের প্রথম শিক্ষিকা, যিনি এ সম্মানে ভূষিত হলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক
১২ বছর বয়সে ডায়েরিতে লিখেছিলেন, 'বৃহৎ কিছু করার দিকে আগ্রহ নেই। মহৎ কিছু করার ইচ্ছা আছে।' ৭৬ বছর বয়সে এসে সেই 'মহৎ কিছুর' স্বীকৃতি পেলেন। রোকেয়া চেয়ার প্রাপ্তিতে কেমন লাগছে শোনা যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসনা বেগমের মুখেই, '২৮ আগস্ট ইউজিসি থেকে ফোনে জানানো হয়। ৩০ তারিখে সেখান থেকে আসা চিঠি পেয়ে নিশ্চিত হই যে এ বছর রোকেয়া চেয়ার হিসেবে আমাকে মনোনীত করা হয়েছে। আমাদের দেশে তো সাধারণত বলা-কওয়া ছাড়া কিছু হয় না। তাই মনোনয়ন পেয়ে প্রথমে খুব বিস্মিত হয়েছিলাম।' নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী উন্নয়ন ও নারীসমাজের অগ্রগতির জন্য যেসব শিক্ষাবিদ ও গবেষক কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দুই বছর মেয়াদের জন্য রোকেয়া চেয়ার মনোনয়ন দিয়ে থাকে। ড. হাসনা বেগম এ দেশের দ্বিতীয় এবং দর্শন বিভাগের প্রথম শিক্ষিকা, যিনি এ বিরল সম্মানে ভূষিত হলেন। আবদুল হাফিজ ও রাবেয়া খাতুনের প্রথম সন্তান ড. হাসনা বেগম। জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
বরাবরই প্রথম
'বাবা চাকরি করতেন কলকাতা পুলিশে। সে জন্য ছোটবেলা থেকেই কলকাতা যাতায়াত ছিল। সেই সময় আমার এক চাচাতো ভাই ছোট বোনসহ আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতার বাণী পীঠ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা এত ভালো হলো যে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করাল। সেখান থেকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে পড়েছি কিছুদিন।' পড়াশোনার হাতেখড়ি সম্পর্কে বলছিলেন ড. হাসনা বেগম। '৪৬-এর দাঙ্গার সময় ঢাকায় এসে মুসলিম গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হন নবম শ্রেণীতে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। স্বামী নুরুদ্দিন মো. সেলিম কলকাতায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এত অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন, 'আমার এক চাচাতো ভাই বিয়ে করতে চেয়েছিলেন আমাকে। কিন্তু তিনি ছিলেন বয়সে আমার চেয়ে ২৫ বছরের বড়! তাই আম্মা রাগ করে বিয়ে দিয়ে দিলেন।' এরপর বেশ কিছুদিন পড়াশোনা করা হয়নি। পরে ১৯৫০ সালে তিন মাসের বাচ্চা পেটে থাকা অবস্থায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণী পেয়ে পাস করেন। এরপর সংসারের প্রয়োজনেই মাসিক ১০০ টাকা বেতনে লেকভিউ প্রিপারেটরি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানেই একদিনের এক ঘটনা বদলে দিল তাঁর জীবন। স্কুলে একদিন শিক্ষকদের মিটিং ডাকা হয়েছিল। এর কিছুই জানানো হয়নি তাঁকে। স্কুলে গিয়ে দেখেন ক্লাস বন্ধ রেখে মিটিং করছেন শিক্ষকরা। প্রধান শিক্ষিক হাবিবুল্লাহ বললেন, 'যারা গ্র্যাজুয়েট শুধু তাদেরই মিটিংয়ে ডেকেছি। আপনি তো গ্র্যাজুয়েট নন।' 'এটা শুনে খুবই খারাপ লেগেছিল। এরপর থেকে ওই স্কুলে আর যাইনি। বাসায় এসে ফুঁপিয়ে ফুঁফিয়ে অনেক কেঁদেছি। সেদিনই মনে মনে সংকল্প করি, যে করেই হোক গ্র্যাজুয়েট আমাকে হতেই হবে। এক ফুফাতো বোন পড়তেন সিটি নাইট কলেজে। তিনি আব্বাকে রাজি করিয়ে আমাকে সিটি নাইট কলেজে (এখনকার সিটি কলেজ) ভর্তির সুযোগ করে দিলেন! ১৯৬৫ সালে কলেজের প্রথম এবং একমাত্র ছাত্রী হিসেবে প্রথম শ্রেণী পেয়ে পাস করি। এরপর ১৯৬৮ ও '৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় রেকর্ড মার্কস পেয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হই।' ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়- নিজের বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ প্রবাদটির কথাই স্মরণ করিয়ে দিলেন ড. হাসনা বেগম। অন্য অনেক বিষয় থাকতে দর্শনকে কেন বেছে নেওয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, "দশম শ্রেণীতে 'পাথ অব পিস' নামে একটি বই ছিল পাঠ্য। সেটাতে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল সম্পর্কে পড়ে তাঁদের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।" মজার বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম শুধু দর্শনেই।
বর্ণিল কর্মজীবন
ড. হাসনা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন ১৯৭২ সালে। ১৯৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটি থেকে প্রফেসর ডি এইচ মনরো এবং প্রফেসর পিটার সিঙ্গারের যৌথ তত্ত্বাবধানে 'মুরস এথিকস থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস' শিরোনামে গবেষণাসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পিএইচডি করতেও তাঁকে কম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়নি। দেশে সন্তানদের রেখে ১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যান পিএইচডি করতে। ওখানে ভালোভাবে থিসিসের কাজ শেষ করে ফিরবেন_এমনই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু মাঝপথে আবার বাধা। ছেলেটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। ড. হাসনা ফিরে এলেন দেশে। নিবিড় পরিচর্যায় কয়েক দিনে সুস্থ করে তুললেন। কিন্তু আবার গিয়ে থিসিস শেষ করে ডক্টরেট ডিগ্রি নেবেন কি না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লেন। কবি সুফিয়া কামাল তখন তাঁকে বললেন, 'তুমি যদি এখন দেশে না-ও থাকো তাতে তোমার পরিবারের খুব একটা ক্ষতি হবে না। কিন্তু যদি পিএইচডি না করো, তাহলে সব পরিশ্রমই ব্যর্থ হবে। তাই যত বাধাই আসুক, তুমি ডিগ্রিটা নিয়েই এসো।' তাঁর কথামতো ফিরে গেলেন অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০০ সালে অবসর নেওয়ার আগে বিভাগের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিন বছর। ২০১০ সাল পর্যন্ত ছিলেন অবৈতনিক অধ্যাপক।
ঘর-সংসার
ছয় সন্তানের জননী ড. হাসনা বেগমকে ঘরে-বাইরে দুদিকই সামলাতে হয়েছে সমান দক্ষতায়। বড় মেয়ে শামারুখ আলম বাংলাদেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট। তারপর দুই মেয়ে বুলরুখ ও মাহেরুখ সেলিম আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। চতুর্থ লালারুখ সেলিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন মো. কায়সার সেলিম লেখালেখি করেন। ড. হাসনার আরেক ছেলের মৃত্যু হয়েছে আগেই।
আপন আলোয়
শিক্ষকতার বাইরে নারীদের নিয়ে কাজ করতে এবং লেখালেখিতে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে ভালোবাসেন এ গুণী মহিলা। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদে ১৬ বছর কাজ করার সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন নানা দেশ। মাসিক 'নতুন দিগন্ত' পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সদস্য তিনি। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ৫০টিরও বেশি গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং ১৫টি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন। অনুবাদ করেছেন জন স্টুয়ার্ট মিলের 'উপযোগবাদ' (১৯৮৫), অ্যারিস্টটলের 'নিপোমেসিয়ান এথিকস' (২০০৬) এবং মুরের 'প্রিন্সিপা এথিকা' ( ১৯৮৫)। দর্শনের ওপর ইংরেজিতে লেখা তাঁর মৌলিক গ্রন্থ হলো 'এথিকস ইন সোশ্যাল প্র্যাকটিস(২০০৬)।' রোকেয়ার ওপর তাঁর ইংরেজি গবেষণা গ্রন্থ 'রোকেয়া দ্য ফেমিনিস্ট : ভিউস অ্যান্ড ভিশন (২০১১)'। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে 'নৈতিকতা নারী ও সমাজ (১৯৯০)', 'মেয়ের কথা মায়ের কথা মেয়েদের কথা (২০০৮)', 'নারী ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০০২)' ইত্যাদি। অভিনয়েও সমান পারদর্শী ছিলেন তিনি। বিটিভিতে তাঁর অভিনীত 'মাল্যদান' নাটকটি বেশ জনপ্রিয় হয়।
স্বপ্ন দেখি
স্বপ্নের কী আর সীমা আছে! সে তো কেবলই নিজের পালে হাওয়া লাগায়। কখনো তা তীর পায়, কখনো না। মাত্র
১২ বছর বয়সে আম্মা বলেছিলেন, 'আর বারান্দায় দাঁড়াতে পারবি না।' তখন বুঝতে পারিনি মেয়েদের ১২ বছর বয়সের সঙ্গে বারান্দায় দাঁড়ানোর সম্পর্ক কী। সে তুলনায় এখনকার মেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীন। এমন সমাজ হোক, যেখানে মানুষ তার প্রাপ্য মর্যাদা পাবে। এ স্বপ্নই এখন অহর্নিশ আশা দেয় আমাকে।









