সোনালি দিনের সাক্ষী -চার বাংলাদেশির এভারেস্ট জয়

চার বাংলাদেশির এভারেস্ট জয়

এভারেস্টে বাংলাদেশি দুই নারীর উপস্থিতির মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হলো বাংলার নারীরাও পারে শীর্ষে যেতে। বাংলাদেশের মেয়েরা রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য পেশায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে সাম্প্রতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হওয়ার পর হিমালয় চূড়ায় আরোহণ নিঃসন্দেহে আরেকটি মাত্রা যোগ করল।

বীরেন মুখার্জী

উপরে বাঁ থেকে (ঘড়ির কাটার দিকে) এম এ মুহিত, মুসা ইব্রাহিম, ওয়াসফিয়া নাজরীন ও নিশাত মজুমদার

হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গে প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল নিউজিল্যান্ডের স্যার অ্যাডমন্ড হিলারি এবং নেপালের শেরপা তেনজিংয়ের। দিনটি ছিল ১৯৫৩ সালের মে মাসের ২৯ তারিখ। হিমালয়ে প্রথম মানব পদচিহ্ন পড়ার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়েছে। হিলারি আর তেনজিংয়ের পথ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ইতোমধ্যে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয়ে তাদের নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি ৭৩ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জাপানি নারী তামাই ওতানাবে। একই সঙ্গে তিনি নিজের করা বিশ্বরেকর্ডও ভেঙেছেন। সবচেয়ে বেশি বয়সে এভারেস্টজয়ী নারীর আগের রেকর্ডটিও তার। এর আগে ২০০২ সালের ১৬ মে ৬৩ বছর বয়সে তিনি হিমালয় জয় করেন। গত ১৯ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৭টার মধ্যে তিনি আবারো হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করেন। পুরুষদের মধ্যে নেপালের মিন বাহাদুর শেরচান ৭৬ বছর ৩৪০ দিন বয়সে হিমালয় জয় করে বেশি বয়সে হিমালয় জয়ের রেকর্ড করেছিলেন ২০০৮ সালে। কিন্তু হিমালয়ের কাছাকাছি দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালির কাছে হিমালয় চূড়া স্পর্শ করাটা ছিল রীতিমত স্বপ্নের মতো। তারপরও দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও পদে পদে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহিম ২০১০ সালের ২৪ মে হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে বাংলাদেশের জন্য অনন্য গৌরব বয়ে আনেন। মুসা ইব্রাহিমের পথ ধরে দ্বিতীয় বাংলাদেশি এম এ মুহিত ২০১১ সালের ২১ মে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে ওড়ান বাংলাদেশের পতাকা। এ বছর ১৯ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টায় হিমালয়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন নিশাত মজুমদার। এর মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশি আরেক নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন ২৬ মে সকালে স্পর্শ করেন এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া। এভারেস্টে বাংলাদেশি দুই নারীর উপস্থিতির মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হলো বাংলার নারীরাও পারে শীর্ষে যেতে। বাংলাদেশের মেয়েরা রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য পেশায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে সাম্প্রতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হওয়ার পর হিমালয় চূড়ায় আরোহণ নিঃসন্দেহে আরেকটি মাত্রা যোগ করল। মুসা ইব্রাহিম হিমালয়ের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক অনেক পুরোন। ব্রিটিশ শাসনামলের রয়াল জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভের বাঙালি অফিসার রাধানাথ শিকদারই প্রথম উচ্চতা মেপে ঠিক করেছিলেন, এভারেস্টই পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। যদিও রাধানাথের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জর্জ এভারেস্টের নাম অনুসারে শৃঙ্গটির নাম দেয়া হয় মাউন্ট এভারেস্ট। ভারতীয় সাবমেরিন কমান্ডার সেনা কর্মকর্তা সত্যব্রত প্রথম বাঙালি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন। ২০১০ সালে ভারতের বাঙালি দেবাশীস বিশ্বাস ও বসন্ত সিংহ রায় এভারেস্ট জয় করেন। তবে বাংলাদেশিদের কাছে তা এত দিন অধরা থাকলেও বাংলাদেশি তরুণ মুসা ইব্রাহিম বাংলাদেশিদের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হন ২০১০ সালের ২৪ মে তারিখে। তিনিই প্রথম সাগরতল থেকে ২৯ হাজার ৩৫ ফুট উচ্চতায় হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। হঠাৎ করেই এভারেস্ট জয়_ বিষয়টি এমন নয়। এর জন্য শারীরিক সামর্থের পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত মাউন্টারিং। মুসা দার্জিলিংয়ে মাউন্টেনিয়ারিংয়ের ওপর দুই মাসের ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়েছেন। পাহাড় জয়ের জন্য অক্লান্ত অনুশীলন করেছেন ৬/৭ বছর। প্রথমে ছোট ছোট পাহাড় ডিঙিয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার মনোবল তৈরি করেছেন। এভারেস্টের সবর্োচ্চ শৃঙ্গে ওঠার আগে তিনি নেপালের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ অন্নপূর্ণা ৪-এর চূড়ায় ২৪ হাজার ৬৮৮ ফুট উচ্চতায় ওঠেন। এরপর ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল শুরু হয় তার মূল অভিযান। তিনি ছয়বার এভারেস্ট জয়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শেরপা গাইড সোম তামাংসহ ২৬ জনের অভিযাত্রী দলের একজন হিসেবে হিমালয় অভিযানে অংশ নেন। ভাটি অঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশিদের রয়েছে উচ্চতাজনিত সমস্যা, হাইটোফোবিয়া-আলটিচিউড সিকনেস। তাছাড়া বাঙালিমন ভ্রমণপিপাসুও নয়, একটু ঘরকুনো। ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশিরা পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার চেয়ে সাগর অভিযানে বেশি আগ্রহী। তাছাড়া হিমালয় অভিযান ব্যয়বহুলও। তবে মুসা ইব্রাহিম সব ধরনের প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব এবং অর্থযোগানদাতাদের সহায়তায় প্রথম বাংলাদেশি এবং চতুর্থ বাঙালি হিসেবে এভারেস্ট চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেশের জন্য যেমন গৌরব বয়ে আনেন তেমনি নাম লেখাতে সক্ষম হন হিমালয়কে পরাভূত করা প্রায় ১২শ' দুঃসাহসী পর্বতারোহীর তালিকায়। ১৯৭৯ সালে লালমনিরহাটের মোগলহাটে জন্ম নেয়া মুসা ইব্রাহিম পেশায় সাংবাদিক। বাবা আনসার আলী, মা বিলকিস বেগম। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুল-কলেজের পাঠ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এম এ মুহিত দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয় পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেন এম এ মুহিত। প্রকৃতি প্রেমী মুহিত পাঠ্যপুস্তকে এডমুন্ড হিলারি ও তেনজিংয়ের এভারেস্ট জয়ের কাহিনী পড়ে প্রথম রোমাঞ্চ অনুভব করেন। '৯৭ সালের অক্টোবরে ১০ বন্ধুর সাথে সীতাকু-ের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে বন্ধুদের মধ্যে প্রথম ১৮শ ফুট উচ্চতায় উঠে পর্বতারোহণ নেশায় মগ্ন হন। ২০০৩ সালে সুমেরু অভিযাত্রী ইনাম আল হকের কাছ থেকে ট্রেকিং ও ফটোগ্রাফিতে হাতে খড়ি নেন মুহিত। ইনাম আল হক তাকে স্বপ্ন দেখান হিমালয় জয়ের। ২০০৩ সালে ইনাম আল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। সদস্য হন মুহিত। ২০০৪ সালে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ও কালাপাথার ট্রেকিং এ অংশ নেন এবং দার্জিলিংয়ের হিমালায়ন মাউন্টেয়ারিং ইন্সটিটিউট এইচএমআই থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ এবং একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৫ সালে উচ্চতর পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করতে শুরু করেন। ২০০৭ সালের মে মাসে নেপালের অন্নপূর্ণা হিমালয় অঞ্চলের চুলু ওয়েস্ট শৃঙ্গ (২১ হাজার ৫৯ ফুট), সেপ্টেম্বরে মেরা পর্বতশৃঙ্গ (২১ হাজার ৮৩০ ফুট), ২০০৮ সালের মে মাসে বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ মানসুলু (২৬ হাজার ৭৮০ ফুট) এবং ২০০৯ সালে দলনেতা হিসেবে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের ষষ্ঠ উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ চো ইয়ো জয় করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো বাংলাদেশি ২৬ হাজার ৯০৬ ফুট বা ৮ হাজার ২০১ মিটার পর্বতারোহীদের সম্মানজনক এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেন। ২০১১ সালের ২৫ মার্চ এম এ মুহিত সফরসঙ্গীদের সঙ্গে হিমালয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সদস্য মুহিত সে সময় মুসা ইব্রাহিমের সঙ্গী থাকলেও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এভারেস্টে উঠতে পারেননি। অবশেষে তার স্বপ্ন সফল হয় ২০১১ সালের ২১ মে। ওইদিন তিনি এভারেস্ট চূড়ায় উড়িয়ে দেন বাংলাদেশের পতাকা। মুসা ইব্রাহিমের পথ ধরে আবারো বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনেন এম এ মুহিত। তিনি সম্প্রতি আরেক এভারেস্ট জয়ী নারী নিশাত মজুমদারের সঙ্গে দ্বিতীয় বার আবারো জয় করেন এভারেস্ট। তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশি এবং পঞ্চম বাঙালি হিসেবে দুবার এভারেস্টশৃঙ্গ জয় করে হয়েছেন গর্বিত ইতিহাসের অংশ। এমএ মুহিতই এক মাত্র বাঙালি যিনি উত্তর ও দক্ষিণ দুই দিক থেকে এভারেস্ট জয় করেছেন। এম এ মুহিত ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ভোলা জেলার দৌলতখান থানার গঙ্গারাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৮৫ সনে পুরান ঢাকার প্রগ্রেজ স্কুল থেকে এসএসসি, ৮৭ সালে নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ৮৯ সালে বি কম পাস করেন। তার পিতা মো. আনোয়ার হোসেন এবং মা আনোয়ারা বেগম। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। নিশাত মজুমদার বাঙালি পুরুষরা যেখানে পাহাড় ট্রেকিংয়ে হিমশিম খায় সেখানে বাঙালি নারীর পাহাড় জয় রীতিমত আশ্চর্যের। অথচ সেই কাজটিই সম্পন্ন করেছেন বাঙালি নারী নিশাত মজুমদার। তিনি গত ১৯ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটায় এভারেস্ট শৃঙ্গে সগৌরবে তুলে ধরেন বাংলাদেশের পতাকা। একই সঙ্গে তিনি প্রথম বাঙালি ও বাংলাদেশি নারী এবং ষষ্ঠ বাঙালি হিসেবে হিমালয়ের এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের ইতিহাসে নিজের নাম লেখান। বাংলাদেশের মেয়ে নিশাতের এ অভিযানে কৃতিত্ব বিশ্বের অন্য দশটা দেশের পর্বতারোহীদের চেয়ে ভিন্নতর। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষ করে সমতলভূমির একজন মানুষ হয়েও বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করার মতো সাফল্য সঙ্গত কারণেই অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। নিশাত মজুমদার ২০০৩ সালে এভারেস্ট বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া কেওক্রাডাংয়ে আরোহণ করেছিলেন। এটা ছিল তার নিতান্তই শখ। এরপর বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে নারী অভিযাত্রী দলের হয়ে আবারও তিনি ২০০৬ সালে ওই পর্বতে ওঠেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিএমটিসি আয়োজিত নারী অভিযাত্রী দলের সঙ্গে তিনি এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প ট্র্যাকিংয়ে অংশ নেন। এরপর ২০০৭ সালের মে মাসে বিএমটিসির অর্থায়নে দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে হিমালয়ের মেরা পর্বতশৃঙ্গ জয় করেন। এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে পরের বছরের মে মাসে হিমালয়ের সিঙ্গচুলি পর্বতশৃঙ্গে ওঠেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ভারতের উত্তর কাশ্মীর গঙ্গোত্রী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী-১ পর্বতশৃঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ অভিযানে অংশ নেন। ২০০৯ সালের এপ্রিলে পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালুতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অভিযানে অংশ নেন। তাছাড়া ২০১১ সালের অক্টোবরে বিএমটিসি আয়োজিত হিমালয়ের চেকিগো নামের একটি শৃঙ্গেও সফল অভিযানে যান। সুতরাং হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণ নিশাতের ধারাবাহিক পর্বতারোহণের শেষ ধাপ। হিমালয় জয় মোটেও সহজসাধ্য নয়। বিশেষ করে নারী অভিযাত্রীর জন্য তা আরো বিপদসঙ্কুল। দুর্গম বৈরী পরিবেশ অর্থাৎ বারবার তুষারধস ও তুষার ঝড়ের মধ্য দিয়ে এভারেস্টের বিপৎসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে হাল না ছাড়ার জন্য নিশাত মজুমদার এভারেস্ট জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। আবদুল মান্নান মজুমদার ও আশুরা মজুমদারের চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় নিশাত। তার জন্ম ১৯৮১ সালে লক্ষ্মীপুরে। নিশাত মজুমদার ফার্মগেটের বটমলি হোম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়াসার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ওয়াসফিয়া নাজরীন প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদারের হিমালয় জয়ের মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত-শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালেন বাংলাদেশের আরেক নারী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন। চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে এই গৌরবের অংশীদার হলেন ২৯ বছর বয়সী ওয়াসফিয়া। ২৬ মে নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৪১ মিনিটে তিনি সর্বোচ্চ চূড়ায় তুলে ধরেন বাংলাদেশের পতাকা। ওয়াসফিয়া নাজরীনের এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ে বাংলাদেশের গৌরবের মুকুটে যুক্ত হলো আরো একটি উজ্জ্বল পালক। নাজরীন দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী ও চতুর্থ বাংলাদেশি হিসেবে জয় করেছেন পৃথিবীর এই সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১১-তে বাংলাদেশ অন সেভেন সামিটস শীর্ষক অভিযানের ঘোষণা দিয়ে অভিযানে নামেন বাংলাদেশের মেয়ে ওয়াসফিয়া নাজরীন। এ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। এ নিয়ে তিন মহাদেশের শীর্ষ চূড়া জয় করলেন তিনি। এর আগে ২০১১ সালের ২ অক্টোবর আফ্রিকা মহাদেশের শীর্ষ পর্বত কিলিমানজারো এবং ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া অ্যাকোনকাগুয়া জয় করেন। ওয়াসফিয়া নাজরীনের গ্রামের বাড়ি ফেনী, তবে তার জন্ম ঢাকায়। ছেলেবেলা কাটে চট্টগ্রামে। লেখাপড়া করেছেন আন্তর্জাতিক মানে। এ জন্য ২০০০ সালে ওয়াসফিয়া যান যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায়। পরে স্কটল্যান্ডে। এখানে পড়েন সামাজিক মনোবিজ্ঞান আর স্টুডিও আর্ট। পড়ালেখা শেষ করে যোগ দেন বেসরকারি সংস্থায় উন্নয়নকর্মী হিসেবে। পরে চাকরি ছেড়ে নিজ উদ্যোগে অনেককে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ অন সেভেন সামিট ফাউন্ডেশন। পরিশেষে বলা যায়, পর্বতারোহণ এক অসাধারণ ঘটনা। বিপদসঙ্কুল, ব্যয়বহুলও। বাংলাদেশের হিমালয় জয়ের নায়ক এখন মুসা ইব্রাহিম, এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজরীন। দৃঢ়সঙ্কল্প আর প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকলে সবকিছুকে যে জয় করা যায়_ মুসা ইব্রাহিমের পর তারই প্রমাণ দিলেন এম এ মুহিত, নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজরীন। পাহাড় মানুষকে কাছে টানে সত্য কিন্তু পাহাড়ে উঠতে চাই প্রবল মানসিক শক্তি। এর সঙ্গে অর্থের যোগ থাকাটাও জরুরি। একজন অভিযাত্রীর জন্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়। তাছাড়া এটাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হয়। বাংলাদেশিরা যে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সক্ষম তা সর্বশেষ নাজরীনের হিমালয় জয়ের মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রমাণিত হয়েছে অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে কোনো ক্ষেত্রেই নারীরা আর পিছিয়ে নেই। সর্বশেষ নাজরীনের এভারেস্ট জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরেক দফায় উজ্জীবিত হয়েছে। সরকার ও দেশের বিত্তবানদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরো অনেক বাংলাদেশি এভারেস্ট চূড়ায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে এমনটি আশা করা দোষের নয়।

Share/Save/Bookmark

abohoman

solid

আর্কাইভ

যোগাযোগ

পাঠক সংখ্যা

164941
TodayToday799
This weekThis week6061
This monthThis month15675
Guests 6