পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল আদমজী পাটকল বন্ধের ১০ বছর পূর্ণ হলো গতকাল শনিবার। অব্যাহত লোকসানের কারণে ২০০২ সালের ৩০ জুন তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার মিলটি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে আদমজী এলাকায় গড়ে উঠেছে ইপিজেড। সেখানে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে ইপিজেড স্থাপনের কারণে। ইপিজেডে প্লট আছে মোট ৩০৭টি। এর মধ্যে কারখানা চালু রয়েছে মাত্র ৩৪টি প্লটে। নির্মাণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫৭টি প্লটে। বাদবাকি ২১৬টি প্লট এখনো খালি পড়ে রয়েছে। দেশের অনেক শিল্পমালিক শিল্প স্থাপনের জন্য জমি পান না বলে প্রায়ই অভিযোগ করেন। অথচ আদমজীর খালি পড়ে থাকা প্লটগুলোয় শিল্প স্থাপন হলে ঠিকই আদমজী ইপিজেডে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বন্ধ হওয়ার আগে আদমজী জুট মিলে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করলেও ইপিজেড স্থাপনের পর সেখানে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে সে সময় সরকার আশা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মিল বন্ধের পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও আদমজীর অসহায় শ্রমিকদের কান্না আজও থামেনি। প্রতিবছর ৩০ জুন এলে দীর্ঘশ্বাস বেড়ে যায় তাঁদের। তবে বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার আদমজীর ২ নং ইউনিট চালুর ঘোষণা দেওয়ায় আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করছেন আদমজী জুট মিলের চাকরি হারা অনেক শ্রমিক।
ইপিজেড সূত্রমতে, ২৯২ দশমিক ৬২ একর জমির ওপর স্থাপিত আদমজী ইপিজেডের ৩০৭টি প্লটের মধ্যে ১৫১টিতে ৬০টি দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দেশি ১৪টি, বিদেশি ৩০টি এবং যৌথ বিনিয়োগের ১৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে।
উৎপাদন শুরু হওয়া কারখানাগুলোয় গার্মেন্টস, জিপার, কার্টন, হ্যাঙ্গার, লেভেল, টেগ, জুতা, সোয়েটার, টেক্সটাইল, ডায়িংসহ শতভাগ রপ্তানিযোগ্য পণ্যসামগ্রী তৈরি করা হয়ে থাকে। এসব কারখানায় বর্তমানে ২০ হাজার ২৮২ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। এর মধ্যে বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। তবে কর্মরত ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর পরও বর্তমানে আরো ১০ হাজার শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে শীতলক্ষ্যার পাড়ে গড়ে ওঠা এ ইপিজেডে।
জানা গেছে, পূর্ব পাকিস্তানের ২২ পরিবারের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই ওয়াহেদ আদমজী ওরফে দাউদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী ও গুল মোহাম্মদ যৌথভাবে ১৯৫০ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ২৯৭ একর জমি নিয়ে আদমজী জুট মিল নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর এক হাজার ৭০০ হেসিয়ান ও এক হাজার সেকিং লুম দিয়ে এই মিলে উৎপাদন শুরু হয়। তখন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত আদমজী জুট মিলে প্রতিদিন গড়ে ২৮৮ টন পাটের চট উৎপাদন করা হতো। মিলে সে সময় তিন হাজার ৩০০টি তাঁত বসানো হয়। ওই সময় মিলের উৎপাদন থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো।
দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত মিলটিতে ২৪ হাজার ৯১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক চাকরি করতেন। সে সময় এটি ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির এক আদেশবলে দেশের অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আদমজী জুট মিলকেও জাতীয়করণ করে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনকে (বিজেএমসি)। তবে এ মিলে ২০০০ সাল পর্যন্ত লোকসান হয় সাড়ে ১২০০ কোটি টাকা। অব্যাহত লোকসানের মুখে অবশেষে ২০০২ সালের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল চিরতরে বন্ধ করে হওয়া হয়।








