মোছাব্বের হোসেন, হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) থেকে ফিরে-
নিজের চা বাগানে গাছের যত্ন নিচ্ছেন সোমা-
ছবি: মঈনুল ইসলাম-
এই মেঘ, এই রোদ্দুর। ধুম বৃষ্টি, আবার রোদ! এমন একটি দিনে আমরা হাজির হলাম চা-বাগানে। বাগানের নাম সোমা টি এস্টেট।
চা-বাগানের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিলেট অঞ্চলের চিত্র। কিন্তু সোমার চা-বাগান সিলেটে নয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বিছনদই গ্রামে। এটাই জেলার প্রথম চা-বাগান। সমতলভূমিতে গড়ে ওঠা চা-বাগানও আগে আর কোথাও হয়েছে বলে জানা যায় না।
এই চা-বাগান দেখে জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ চা-চাষে উৎসাহী হয়ে উঠছেন। যাঁর নামে বাগানটি, তিনিই স্বপ্ন দেখেছিলেন এ বাগান গড়ার। পুরো নাম শাহানারা বেগম সোমা। তাঁর বাগান থেকে এখন চা উৎপাদিত হচ্ছে। শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার বেশির ভাগই ওই এলাকার অভাবী নারী।
শুরুর কথা: গ্রামের আর দশটা মেয়ের মতো অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি সোমা। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে চালিয়ে গেছেন লেখাপড়া। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন ২০০০ সালে। পড়াশোনা চলাকালেই চাকরি করেন কয়েকটি বেসরকারি সংস্থায়। লেখাপড়া শেষেও চলতে থাকা সেই চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় যান। একবার সিলেটে গিয়ে চা-বাগানের মায়ায় পড়েন। এরপর পঞ্চগড়ে বাগান দেখে তাঁর মনে স্বপ্ন জাগে চা-বাগান করার।
ইতিমধ্যে বিয়ে করেন সোমা। স্বামী ফেরদৌসকে জানান স্বপ্নের কথা। ফেরদৌসেরও ঝোঁক ছিল গাছপালা লাগানোর দিকে। ফলে খুব উৎসাহ নিয়ে সায় দিলেন স্ত্রীর কথায়। পূর্ব বিছনদই গ্রামের মাটি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলো চা বোর্ডে। বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে বললেন, সেখানে চায়ের চাষ করা যাবে।
এরপর কোনো ঋণ ছাড়াই এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া থেকে চারা এনে গ্রামের আড়াই একর জমিতে তা লাগালেন সোমা ও ফেরদৌস। পরম মমতায় নিজের সন্তানের মতো যত্ন নিতে থাকলেন চারাগুলোর।
শুরুতে অনেকে বিশ্বাস করতে চাননি যে এগুলো চায়ের গাছ। অনেকে নিরুৎসাহিতও করেছেন। কিন্তু সোমারা তা আমলে নেননি। তারই ফল এখন সেখানকার নজরকাড়া চায়ের বাগানটি। সোমা টি এস্টেট এখন সাত একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত।
চা ও চায়ের চারা: ২০১০ সাল থেকে নিজের বাগান থেকে চা উৎপাদন করছেন সোমা। পাতা সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে হামানদিস্তা দিয়ে গুঁড়া করে বাড়িতেই সেগুলো প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। যাঁরা চা-বাগান দেখতে আসেন, তাঁরাই আগ্রহী হয়ে কেনেন এই চা। এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে খুব কম দামে এই চা-পাতা পাওয়া যাচ্ছে। এখন এর চাহিদাও বেশ। সোমা জানান, এ বছর এখন পর্যন্ত ৩৫ হাজার কেজি কাঁচা চা-পাতা পেয়েছেন তিনি। তা থেকে আট হাজার কেজি চা উৎপাদন করেছেন। প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। হামানদিস্তা দিয়ে একজন নারী শ্রমিক দিনে তিন কেজি চা প্রক্রিয়াজাত করতে পারেন। এ জন্য তাঁরা মজুরি পান এক বেলা খাবার ও ১০০ টাকা।
সোমা চায়ের চারা তৈরির নার্সারিও করেছেন। পলিব্যাগে ছোট ছোট সবুজ কচি চা-চারার পাশে গিয়ে সোমা জানালেন, স্বামী-স্ত্রী পঞ্চগড় থেকে চারা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। শুরুতে চারা আনতে পরিবহন খরচ ছাড়াও অনেক চারা নষ্ট হতো। তাই নিজেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে চারা তৈরি করছেন। কাটিং পদ্ধতিতে এ বছর তাঁরা দুই লাখ চারা তৈরি করেছেন। প্রতিটিতে খরচ পড়েছে পাঁচ টাকা। বিক্রি করছেন ১০ টাকা করে। জেলার বিভিন্ন স্থানের মানুষ এই চারা কিনে নিচ্ছেন। অনেকে নিজেদের বসতবাড়িতেও দু-একটি করে চারা লাগিয়েছেন।
আলো ছড়াচ্ছে এই বাগান: সোমার চা-বাগান আলো ছড়াচ্ছে সমগ্র জেলায়। সেই আলোয় উদ্ভাসিত অনেকে শুরু করেছেন চায়ের চাষ। চা বোর্ডের হিসাবে লালমনিরহাটে এখন ৭৫ জন চা-চাষি রয়েছেন। ১৩টি বাগান হয়েছে। সোমা জানান, চায়ের চাষ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে জমি চাষের ঝামেলা নেই। শুধু পরিচর্যা করে পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা নিতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। গরু-ছাগলে খায় না, ছায়াও কোনো সমস্যা নয়। একবার গাছ লাগালে সারা জীবন এর ফল ভোগ করা যায়। এক বিঘা জমিতে চাষ করলে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা উপার্জন করা সম্ভব।
গত মার্চ মাসে লালমনিরহাট সদর আসনের সাংসদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের, চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মাহাবুবুল হাসান এবং চা বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা সোমার চা-বাগান পরিদর্শন করেন। এ সময় চা বোর্ডের জেলা কার্যালয় লালমনিরহাট থেকে সরিয়ে সোমার বাগানের পাশে স্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশ চা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ইসমাইল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা হাতীবান্ধার মাটির নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছি। সেখানকার মাটি চা-চাষের উপযোগী এবং বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন সম্ভব।’
পঞ্চগড় চা বোর্ডের আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি একাধিকবার সোমা টি এস্টেটে গিয়েছেন। সেখানে চায়ের চাষ আরও লাভজনক হবে। তবে চাষিদের গাছের পরিচর্যায় আরও মনোযোগী হতে হবে।
কিছু স্বপ্ন: সোমা এখন স্বপ্ন দেখেন, সেখানে একটি চা প্রক্রিয়াজাত করার কারখানা তৈরি হবে। চা-পাতা রোদে শুকাতে হবে না। হামানদিস্তা দিয়ে গুঁড়া করতে হবে না। কখনো আবহাওয়া অনুকূল না হলেও চা নষ্ট হবে না। ফেরদৌস জানালেন, কারখানা হলে এখানেও বিশ্বমানের চা উৎপাদন সম্ভব।
বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, সোমা ও ফেরদৌসের চা-চাষের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। লালমনিরহাটে চা উৎপাদনে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। চা উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্র স্থাপন, বাজারজাতকরণসহ সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। এরই ধারাবাহিকতায় চা বোর্ডের কার্যালয় সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিনোদনকেন্দ্র: এত দিন ওই অঞ্চলে তেমন কোনো বিনোদনকেন্দ্র ছিল না। চা-বাগান হওয়ার পর ওই অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ তা দেখতে আসছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাসফরে আসছে। সোমা জানান, পর্যটক-দর্শনার্থীদের জন্য সেখানে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে।








